পৃথিবীর ইতিহাসে যে ক’জন মানুষ সংগীতকে অমরত্ব দিয়েছেন, তাদের মধ্যে ভোলফগাং আমাদেউস মোজার্ট (১৭৫৬-১৭১১) অন্যতম। মাত্র ৩৫ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনে তিনি সংগীতের যে বিশাল ভাণ্ডার রেখে গেছেন, তা আজও বিশ্বজুড়ে বিস্ময় এবং অনুপ্রেরণার উৎস। ক্লাসিক্যাল যুগের এই মহান সুরকারের জীবন ছিল প্রতিভা, পরিশ্রম এবং কিছুটা ট্র্যাজেডির সংমিশ্রণ।
১৭৫৬ সালে অস্ট্রিয়ার সালজবার্গে এক সংগীত পরিবারে মোজার্টের জন্ম। বাবা লিওপোল্ড মোজার্ট নিজেই ছিলেন একজন দক্ষ সংগীত শিক্ষক। মোজার্টের প্রতিভা ছিল জন্মগত। মাত্র ৫ বছর বয়সেই তিনি সংগীত পড়তে ও লিখতে পারতেন এবং ৬ বছর বয়সে শুরু করেন প্রথম সুর সৃষ্টি। তার প্রতিভা দেখে মুগ্ধ হয়ে বাবা লিওপোল্ড তাকে ইউরোপের বিভিন্ন রাজদরবারে নিয়ে যান। প্যারিস থেকে লন্ডন—সর্বত্রই এই বিস্ময়বালককে নিয়ে হইচই পড়ে যায়।
মোজার্টের সংগীত ক্যারিয়ারকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়। ১৭৬৬ থেকে ১৭৬৯ সাল পর্যন্ত সালজবার্গে তিনি জার্মান ও লাতিন ভাষার বিভিন্ন নাটকের জন্য সুর করেন। মাত্র ১৪ বছর বয়সে তিনি ইতালিতে যান অপেরা রচনার দক্ষতা অর্জনের জন্য। সেখানে মিলান এবং রোমে তিনি অভাবনীয় সাফল্য পান। এমনকি পোপের কাছ থেকে সম্মানজনক নাইটহুড উপাধিও লাভ করেন।
তার জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সময় ছিল ভিয়েনায় কাটানো শেষ ১০ বছর। এই সময়েই তিনি তার সেরা কাজগুলো উপহার দেন। তার বিখ্যাত তিনতি সিম্ফনি (৩৯, ৪০ এবং ৪১ নম্বর) তিনি মাত্র ছয় সপ্তাহের ব্যবধানে রচনা করেছিলেন, যা সংগীত ইতিহাসে একটি বিরল ঘটনা।
মোজার্ট ৬০০-এর বেশি কাজ সম্পন্ন করেছেন। তার জনপ্রিয় অপেরাগুলোর মধ্যে রয়েছে _ ১.দ্য ম্যারেজ অফ ফিগারো (১৭৮৬)
২.ডন জিওভানি (১৭৮৭)
৩.দ্য ম্যাজিক ফ্লুট (১৭৯১)
মোজার্টের জীবনের শেষ অধ্যায় ছিল বেশ করুণ। ১৭৯১ সালে যখন তিনি ‘দ্য ম্যাজিক ফ্লুট’ নিয়ে কাজ শেষ করেন, তখন তার শারীরিক অবস্থা খারাপ হতে থাকে। জীবনের শেষ সময়ে তিনি ‘রিকুইয়েম’ (Requiem) নামক একটি অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সুর তৈরির কাজ শুরু করেন। অদ্ভুতভাবে মোজার্ট বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন যে, তিনি নিজের মৃত্যুর জন্যই এই সুরটি রচনা করছেন। দুর্ভাগ্যবশত, এটি শেষ করার আগেই ১৭৯১ সালের ৫ ডিসেম্বর অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় এই মহান শিল্পীর মৃত্যু হয়। পরে তার ছাত্র ফ্রাঞ্জ সুজমায়ার এটি সম্পন্ন করেন।
সংগীতবোদ্ধাদের মতে, মোজার্ট কেবল একজন প্রতিভাবানই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন একজন কঠোর পরিশ্রমী শিক্ষার্থী। তিনি হাইডন এবং বাখের মতো মহান সুরকারদের কাজ গভীরভাবে অধ্যয়ন করতেন। আজ কয়েক শতাব্দী পার হলেও তার সুরের মূর্ছনা বিশ্বের প্রতিটি কোণে সমানভাবে সমাদৃত।

