তারুণ্যের শক্তি অমিত। আবেগ তাকে অনন্য গতি দেয়। হার্বাট হুভারের ভাষায়―“Older men declare war. But it is youth that must fight and die.” তারুণ্যের দুর্বার গতি―নিজের চারপাশকে নতুন করে ঢেলে সাজাবার প্রেরণা দেয়। সমাজ ও তার তথাকথিত নীতিমালাকে চ্যালেঞ্জ করবার স্পিরিট কাজ করে অন্তর্জগতে। অথচ যখন বাস্তবতা তরুণ শক্তিকে পাল্টা আঘাত হানে, তখন ঝরে যায় সিংহভাগ নবীনসেনানী। কিন্তু এত অল্পতেই কেন হারিয়ে যায় প্রলয়সম্ভব প্রতিভারা ? আসুন ৫টি যৌক্তিক পয়েন্টের আলোকে সেই পর্যালোচনা করি।
১) জীবিকা এবং জীবিকা : সেই ছোটবেলা থেকে ভয় দেখানো হচ্ছে―পড়াশোনা কর, নইলে ভাত জুটবেনা। ভালো রেজাল্ট কর, নইলে ভালো চাকরি মিলবেনা। অর্থাৎ জ্ঞান অর্জনের সাধনাকে উৎসাহিত করার জায়গায়, জীবিকাকেন্দ্রিক ভয়কে প্রতিস্থাপন করেন আমাদের অভিভাবক সমাজ। লেখাপড়ার মাধ্যমে অর্থযোগ ঘটানোই যেন জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য। সমাজ, প্রতিষ্ঠান, শিক্ষক সবার মুখেই সেই একই বাণী―টাকাই সব। ফলে এগোতে গেলে যখন টাকার দরকার হয়, তখন নবীন সেনানীরা সহসাই আপোষ করে ফেলেন।বিকল্প রাস্তায় বিপ্লব ঘটানোর চিন্তা ব্যতিরেকেই চাকরির মাধ্যমে নিরাপদ জীবনের ছায়াতল বেছে নেন অধিকাংশ তরুন। লেখা থেমে যায় তখন থেকে। কলম আপোষ করে নেয় জীবিকার সাথে..।
২) বাস্তব জ্ঞান : এটা ভীষণ সত্যি কথা যে, বাস্তব অত্যন্ত কঠিন। পরিস্থিতি অনুকূল থাকবে, আর আপনি টপাটপ সবকিছু হাতিয়ে নেবেন; এমনটা ঘটেনা। নিজের গান, কবিতা, সাহিত্য নিয়েও তেমনি অজস্র প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এজন্য পরিস্থিতির চাপ সামলানোর উপায় বের করতে হয় নিজেকেই। নইলে পাততাড়ি গুটিয়ে নিরাপদ ছাউনী বেছে নেয়া ছাড়া গত্যন্তর থাকেনা। সুতরাং শিল্পী, কবি, সাহিত্যিক যাই হোন না কেন; আবেগের সাথে সাথে টিকে থাকার মত বাস্তব জ্ঞানটাও চাই।
৩) উদ্দেশ্যের দৃঢ়তা : এমনটা অনেককেই বলতে শুনি যে, তিনি একসময় দুর্দান্ত কলম সৈনিক ছিলেন। কর্মজীবনে অনুপ্রবেশের পর তার সেই শক্তি আর অবশিষ্ট নেই। এখন তিনি বেজায় রকমের ব্যাস্ত। আগের দিনগুলোর ইচ্ছেকে তিনি এখন কল্পনাবিলাস বলে চিহ্নিত করেন। আসলে এদের মত মানুষরা ভেতর থেকে কখনই সমাজ বা দেশকে কিছু দেবার মত করে ভাবেননি। নিজের মেধার সাথে আবেগের সম্মিলনে খানিকটা দৌড়েই তাই পথ পরিবর্তন করে ফেলেছেন। উদ্দেশ্যের সততা ও দৃড়তাকে এখানে প্রশ্নবিদ্ধ করার যথেষ্ট সুযোগ আছে। একজন স্বপ্নবাজ এতো সহজে কেন হার মানবেন ? তার তো আরো অনেক লড়াই করবার কথা, তাই না ? কর্মজীবনেও চাইলে সাংস্কৃতিক তৎপরতা চালানো যায়, বিশ্বব্যাপী এর অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে। সুতরাং, যাই করবেন তা অবিচল চিত্তেই করা উচিত।
৪) প্রশিক্ষণ ও সাধনা : আমরা আবেগকে সম্বল করে অনেককে এগোতে দেখি। দলীয় সংকীর্ণতা ও দূষিত রাজনীতি অনেক ক্ষেত্রে এর ফায়দা আদায় করে। কর্মীর কাছ থেকে শিল্প-সাহিত্যের ফলটা নিতে সবাই তৎপর থাকে। কিন্তু কেউ তার প্রশিক্ষণের কথা ভাবেনা। ফলে কবিরা কবিতা লিখেন ছন্দ ও মাত্রাজ্ঞান ব্যতিরেকে। অল্প কিছু শব্দের ভান্ডার নিয়ে গান ও কাব্যে মনোনিবেশ করেন অনেকে। দুর্বল ভাষাজ্ঞান ও ব্যাকরণগত অজস্র ত্রুটি নিয়েই নিজেদের গায়কী, আবৃত্তি বা অভিনয়কে এগিয়ে নিতে দেখা যায় নবীনদের।অথচ গুরু ও প্রশিক্ষণ ছাড়া এসব কাজে বেশি দূর এগোনো প্রায় অসম্ভব।
৫) শিল্পকলায় পেশাদারীত্ব অর্জন : কেবল গল্প, কবিতা বা গান লিখলেই জীবন চলবেনা। অর্থনৈতিক বাস্তবতার আলোকে সেসবের যথোপযুক্ত বাণিজ্যিকায়ন ও বিপনন প্রয়োজন। শিল্প দিয়ে অর্থ প্রাপ্তি নিশ্চিত করা সময়ের দাবী। তা নাহলে শিল্পীকে অন্যকিছু ভাবতে হবে বৈকি। হয়তো অনেকেই বলবেন―আদর্শের কথা। আরে ধূর মশাই, এক গ্লাস ফিল্টার পানি খেতেও যেখানে পয়সা খরচ করতে হচ্ছে; সেখানে শিল্পী-কবি-সাহিত্যিক বা গায়করা কী করে আপনার শুকনো আদর্শ নিয়ে পড়ে থাকবে ? পেটতো তাদেরও আছে, তাই না ? সুতরাং, কোন পথে এগোলে নিজের আর্ট-কালচার চর্চাকে অর্থনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করা যাবে, সেই ভাবনাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খামোকা আদর্শ কপচায়ে যারা ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করেন, তাদের ধিক্কার জানাই।
মোট কথা আমরা চাইনা নতুনরা হারিয়ে যাক। তাদের স্বপ্ন ও আবেগ একটা ইতিবাচক পরিণতি লাভ করুক―এটাই প্রার্থনা। আশা করি উপরোক্ত পর্যালোচনাটি সাংস্কৃতিক যোদ্ধাদের যৌক্তিকভাবে সামনে এগোতে সহায়ক হবে।

