‘মধ্যযুগ’ বলে ইতিহাসের যে সময়কে অবজ্ঞা করা হয়ে থাকে, প্রকৃত পক্ষে তার বাস্তবতা ছিল—সম্পূর্ণ আলাদা! মানবতার শ্রেষ্ঠতম শিক্ষক মহানবী (সাঃ) এর ওফাতের পর, মধ্যপ্রাচ্য থেকে মুসলিমরা ক্রমশ রাজ্য বিস্তার করতে থাকেন। এক সময় তিন মহাদেশজুড়ে এক বিশাল সাম্রাজ্য মুসলমানদের অধিকারে আসে। সামরিক বিজয়ের পাশাপাশি বৃদ্ধি পেতে থাকে —জ্ঞান-গবেষণার পরিসর। অজস্র মণিষীর উদ্ভব হয় মক্কা, মদীনা, দামেস্ক, বোখারা, বাগদাদ, বসরা, কায়রো প্রমুখ ইতিহাস বিখ্যাত শহর থেকে। সেইসব মণিষীদেরই একজন ছিলেন —ইবনে খালদুন। একাধারে সমাজ বিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ,
ইতিহাসবিদ হওয়ার পাশাপাশি তিনি ছিলেন জ্ঞানের জগতে এক সব্যসাচী পুরুষ। সমাজ, রাষ্ট্র নিয়ে তার গবেষণা ছিল—অনেক ব্যাপক ও বিস্তৃত। মানব সমাজের প্রয়োজনীয়তাকে খাদ্য এবং নিরাপত্তা, এই দুটি বিষয় দিয়ে ব্যাখ্যা করেন ইবনে খালদুন। তার মতে, সমাজ গঠন করে সেখানে কেউ ব্যক্তিগতভাবে জীবনধারণ করতে পারে না। সমাজের উন্নয়নের জন্য শ্রমবণ্টনের অপরিহার্যতাও উল্লেখ করেন ইবনে খালদুন। আবার তার মতে, রাষ্ট্রের উদ্ভব হয় মানুষের স্বভাবজাত আক্রমণাত্মক প্রকৃতি থেকে সমাজকে নিরাপদ করতে। একদিকে যেমন সমাজ ছাড়া রাষ্ট্র কল্পনা করা যায় না, অন্যদিকে রাষ্ট্রহীন সমাজের অস্তিত্ব টিকতে পারে না। এসব বিষয় আলোচনা করতে গিয়ে খালদুন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের অবতারণা করেন। সেটি হচ্ছে রাজনৈতিক ও সমাজ কেন্দ্রিক ইতিহাস লিখতে গিয়ে ঐতিহাসিকগণের বস্তুনিষ্ঠতার অভাব। তিনি দেখিয়েছেন, কীভাবে ইতিহাস রচনায় তারা ভুল ব্যাখ্যা করেন, কখনোবা ভুল প্রসঙ্গে ভুল উদাহরণ প্রয়োগ করেন, অতিরঞ্জন করেন, আবার নিজের বিশ্বাস থেকে ইতিহাস রচনা করেন কিংবা তথ্যসূত্রের যাচাই করেন না।
ইবনে খালদুন একটি সমাজকে একটি জৈব অবয়ব আকারে কল্পনা করেছেন, যা প্রতিটি সমাজের ক্ষেত্রেই মোটামুটি একই রকম। ইতিহাস থেকে সংগৃহীত তথ্য, নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতা আর ধর্মীয় বিশ্বাস, এই সব কিছু মিলিয়ে তিনি তার এই মতামত দিয়েছেন। তার মতে, সকল সমাজের মৌলিক কাঠামোর মধ্যেই রয়েছে একটি অন্তর্নিহিত মিল, যা মানুষের সহজাত প্রকৃতির মতোই। যে কারণে তার সমাজ কাঠামোর আলোচনা প্রতিফলিত হয়েছে আফ্রিকার যাযাবর কিংবা আরবের বেদুইন আর তুরস্কের কুর্দিদের মধ্যেও।
ইবনে খালদুনের মতে, ইতিহাস সর্বদা পরিবর্তনশীল, যা ঘটে দুই শ্রেণীর মানুষের হাত ধরে। এক হলো যারা যাযাবর, আরেক হচ্ছে সমাজবদ্ধ বা দলবদ্ধ জনসমষ্টি। আর এই দুই শ্রেণীর মাঝে রয়েছে কৃষক শ্রেণী। এদের মধ্যে যাযাবররা হচ্ছে স্বভাবে সবচেয়ে উগ্র এবং অসভ্য, যাদের সভ্যতার সাথে সর্বদাই একপ্রকার প্রতিকূল সম্পর্ক রয়েছে। তবে এদের একটি গুণ হচ্ছে নৈতিকভাবে এরা কলুষতামুক্ত এবং অতিমাত্রায় স্বাধীনতাপ্রিয় এবং স্বনির্ভর। অন্যদিকে স্থির দলবদ্ধ জনগোষ্ঠীর হাত ধরে জগতের যাবতীয় পরিবর্তন, উন্নয়ন এবং একই সাথে ধ্বংস সাধন হয়। এরা একদিকে যেমন জ্ঞান বিজ্ঞানে পৃথিবীকে প্রতিনিয়ত অধিক বসবাসযোগ্য করে তোলে, মুদ্রার অপর পিঠে এরাই আবার অর্থের মোহে দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে অন্যায়ে জড়িয়ে পড়ে আর পৃথিবীর ক্ষতি করে। এসব আলোচনা করতে গিয়েই খালদুন তার বিখ্যাত ‘আসাবিয়া’ তত্ত্বের অবতারণা করেন। এই আসাবিয়া মানে হচ্ছে ‘দলগত সংহতি’ কিংবা ‘সামাজিক সংহতি’। তার মতে যাযাবরদের মধ্যে আসাবিয়া কম কাজ করে বলেই তারা যাযাবর। আসাবিয়া তথা সামাজিক সংহতি থেকেই মানুষ দলীয়ভাবে বসবাসের চিন্তা করতে শেখে।
ইবনে খালদুন একটি রাষ্ট্রের উত্থান-পতনের মূল বিষয় হিসেবে আসাবিয়ার কথা উল্লেখ করেন। প্রথমত আসাবিয়া থেকে একটি সমাজ এবং একটি রাষ্ট্র গড়ে ওঠে। শাসকগণ সে সমাজ প্রাথমিকভাবে প্রজাদের তথা সাধারণ জনগণের চাহিদা অনুযায়ী পরিচালনা করে। কিন্তু ধীরে ধীরে তারা ক্ষমতালোভী হয়ে ওঠেন এবং প্রজাদের দমিয়ে রাখতে অধিক সৈন্য নিয়োগ দেন। তারা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বৃদ্ধির মাধ্যমে একপ্রকার জাল তৈরি করেন, যে জালে অধিকাংশ সাধারণ মানুষ আটকে থাকে। সাধারণের চেয়ে তার সামরিক বাহিনীর জন্য অধিক ব্যয় করে এবং এর ফলে বাজারে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পায়। সামরিক খরচ বহন করতে সরকার করের পরিমাণ বৃদ্ধি করে আর এতে করে বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হয়, উৎপাদন ব্যহত হয়। ধীরে ধীরে সরকার একা হয়ে যায় এবং যে জনগণ তাদের ক্ষমতায় এনেছিল তাদের সাথেই সরকারের দূরত্ব সৃষ্টি হয়। এ অবস্থায় শাসক গোষ্ঠী কখনোবা ধর্মকে ব্যবহার করে পুনরায় জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারে কিন্তু তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। একসময় শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতাচ্যুত হয় এবং আসাবিয়া ভেঙে নতুনরূপে গড়ে ওঠে। আবার নতুন শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতায় আসে এবং আগের চক্রটির পুনরাবৃত্তি হয়। ইবনে খালদুনের এই দর্শন অসাধারণ নয় কি পাঠক? আজ থেকে ৭০০ বছর পূর্বে তিনি যে রাজনৈতিক দর্শন দিয়ে গেছেন তা আজকের সমাজেও প্রবলভাবে বিদ্যমান!
ইবনে খালদুনের বৈজ্ঞানিক দর্শন কিছুটা ইমাম গাজ্জালির মতোই ছিল। তিনি বিজ্ঞানকে দুটি ভাগে বিভক্ত করেন। ধর্মীয় বিজ্ঞান এবং অধর্মীয় বিজ্ঞান। অধর্মীয় বিজ্ঞানকে আবার দু’ভাগে ভাগ করেন। একটি হচ্ছে প্রয়োজনীয় এবং অন্যটি অপ্রয়োজনীয়। মূলত অতিপ্রাকৃত ব্যাপারগুলোর সাথে সম্পর্কিত বিজ্ঞানকেই তিনি অপ্রয়োজনীয় বলেছেন যেমন, জাদু, আলকেমি বা অপরসায়ন এবং জ্যোতির্বিজ্ঞান। তার দর্শনের মূল মতাদর্শ ছিল, ধর্ম আর বিজ্ঞান একসূত্রে গাঁথা। অতীন্দ্রিয়বাদকে তিনি ফিকহশাস্ত্রের আওতায় এনে আলোচনা করেছেন। তার মতে, মানুষের জ্ঞান চর্চা অবশ্যই করতে হবে এই জ্ঞান প্রাত্যহিক জীবনে কাজে লাগাতে হবে। কিন্তু বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা অবশ্যই একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখা উচিৎ। এমন পর্যায়ে যাওয়া উচিৎ নয় যেখানে মানুষের বুদ্ধি যথেষ্ট নয়। তার নিকট সে পর্যায়গুলো হচ্ছে সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব, তার একত্ব, মৃত্যু পরবর্তী জীবন, ধর্মীয় ভবিষ্যদ্বাণী ইত্যাদি। মানুষ বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা করবে কিন্তু অবশ্যই এসব বিষয়কে বাদ রেখে।
আজ থেকে প্রায় ৭০০ বছর পূর্বে ইবনে খালদুন এমন দর্শন দিয়ে গেছেন, যা আজও পৃথিবীর পূর্বে-পশ্চিমে সর্বত্র সমানভাবে বিরাজমান। কতটা প্রজ্ঞা প্রয়োজন হয় এরকম চিন্তা করার জন্য? একজন দার্শনিক ইবনে খালদুন তাই চিরন্তন আদর্শ হয়ে থাকবেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
চতুর্দশ শতাব্দীর এক অস্থির সময়ে উত্তর আফ্রিকার তিউনিসিয়ায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন ক্ষণজন্মা মনীষী আবদুর রহমান ইবনে খালদুন (১৩৩২-১৪০৬ খ্রি.)। তাকে নির্দ্বিধায় মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ সমাজবিজ্ঞানী, ইতিহাসের দার্শনিক এবং আধুনিক অর্থনীতির অন্যতম পথিকৃৎ বলা যায়। তার অমর সৃষ্টি ‘আল-মুকাদ্দিমা’ (The Prolegomena) কেবল একটি ইতিহাসের ভূমিকা নয়, বরং এটি মানব সমাজের গঠন, বিকাশ এবং পতনের এক বিজ্ঞানভিত্তিক বিশ্লেষণ। তিনি ইতিহাসকে নিছক রাজা-বাদশাহদের দিনপঞ্জি থেকে বের করে এনে কার্যকারণ সম্পর্কের (Cause and Effect) এক জটিল সমীকরণে দাঁড় করিয়েছেন। তাঁর আরো কিছু অবদানকে নিচে আলোচনা করা হল।
ইতিহাস রচনায় বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি ও ঐতিহাসিকদের ভ্রান্তি :
ইবনে খালদুন তার সময়ের এবং পূর্ববর্তী ঐতিহাসিকদের কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি লক্ষ্য করেন যে, অধিকাংশ ঐতিহাসিক কোনো ঘটনার পেছনের সামাজিক, অর্থনৈতিক বা মনস্তাত্ত্বিক কারণ অনুসন্ধান না করে কেবল শোনা কথার ওপর ভিত্তি করে ইতিহাস রচনা করেছেন। তিনি ঐতিহাসিকদের সাতটি প্রধান বিচ্যুতির কথা উল্লেখ করেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
- পক্ষপাতিত্ব: নির্দিষ্ট মতবাদ বা শাসকের প্রতি দুর্বলতা।
- তথ্যের উৎস যাচাই না করা: অবিশ্বাস্য গালগল্পকে সত্য বলে চালিয়ে দেওয়া।
- বাস্তবতার জ্ঞান না থাকা: কোনো ঘটনা আদৌ ঘটা সম্ভব কি না (Law of Possibility), তা বিচার না করা।
খালদুন বলেন, “ইতিহাসের একটি বাহ্যিক রূপ আছে এবং একটি অভ্যন্তরীণ রূপ আছে। বাহ্যিক রূপ হলো ঘটনার বিবরণ, আর অভ্যন্তরীণ রূপ হলো ঘটনার কারণ ও উৎসের গভীর বিশ্লেষণ।” তিনি ইতিহাসকে ‘ইমরান’ বা ‘মানব সভ্যতার বিজ্ঞান’-এ রূপান্তর করার প্রয়াস পান।
সমাজ গঠনের আবশ্যকতা: মানুষ ‘সামাজিক জীব’:
ইবনে খালদুন অ্যারিস্টটলের মতোই বিশ্বাস করতেন যে, মানুষ প্রকৃতিগতভাবেই সামাজিক। তিনি সমাজ গঠনের দুটি আবশ্যিক কারণ দর্শিয়েছেন:
- খাদ্যের জোগান ও শ্রমবিভাজন: একজন মানুষের পক্ষে একাই চাষাবাদ, ফসল কাটা, পেষাই করা এবং রুটি তৈরি করা সম্ভব নয়। এমনকি রুটি তৈরির যন্ত্রপাতির জন্যও কামার বা কুমোরের প্রয়োজন। তাই বেঁচে থাকার জন্য মানুষকে পরস্পরের শ্রমের ওপর নির্ভর করতে হয়। একেই তিনি শ্রমবিভাজন বা ‘Division of Labor’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, যা আধুনিক অর্থনীতিরও মূল ভিত্তি।
- নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা: মানুষ ছাড়া অন্য প্রাণীদের আত্মরক্ষার জন্য নখ বা দাঁত দেওয়া হয়েছে, কিন্তু মানুষকে দেওয়া হয়েছে বুদ্ধি ও হাত। বন্য প্রাণী বা আগ্রাসী শক্তির হাত থেকে বাঁচতে মানুষকে দলবদ্ধ হতে হয়। সমাজ ছাড়া মানুষের অস্তিত্ব বিপন্ন, আবার কর্তৃত্ব বা রাষ্ট্র ছাড়া সমাজ বিশৃঙ্খল।
যাযাবর বনাম নগর সভ্যতা: দ্বন্দ্ব ও বিকাশ :
ইবনে খালদুন মানব সমাজকে প্রধানত দুটি ধারায় বিভক্ত করেছেন:
- বাদাওয়া (Bedouin/Nomadic): এরা মরুভূমি বা দুর্গম এলাকায় বসবাস করে। তাদের জীবন কঠোর, তারা সাহসী, স্বনির্ভর এবং নৈতিকভাবে পবিত্র। তাদের মধ্যে দলীয় সংহতি বা ‘আসাবিয়া’ থাকে প্রবল।
- হাদারা (Sedentary/City Life): এটি হলো নগর সভ্যতা। এখানে বিলাসিতা, আরাম-আয়েশ, শিল্পকলা ও বিজ্ঞানের বিকাশ ঘটে। কিন্তু অতিরিক্ত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য নগরবাসীকে অলস, ভীরু এবং দুর্নীতিপরায়ণ করে তোলে।
খালদুনের মতে, ইতিহাসের চাকা ঘোরে এই দুই শ্রেণীর দ্বন্দ্বে। সাহসী যাযাবররা তাদের প্রবল সংহতির জোরে বিলাসিতায় মগ্ন দুর্বল নগর সভ্যতাকে আক্রমণ করে এবং দখল করে নেয়। এরপর তারা নিজেরাই নগরে বসতি স্থাপন করে এবং কালক্রমে তারাও বিলাসী ও দুর্বল হয়ে পড়ে, যা তাদের পতনের পথ প্রশস্ত করে।
‘আসাবিয়া’ তত্ত্ব: ক্ষমতার প্রাণভোমরা :
ইবনে খালদুনের রাষ্ট্রদর্শনের মূল স্তম্ভ হলো ‘আসাবিয়া’ (Asabiyyah)। এর আভিধানিক অর্থ গোত্রপ্রীতি হলেও খালদুন একে ‘সামাজিক সংহতি’ (Social Solidarity) বা ‘Group Feeling’ হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
- একটি রাষ্ট্র গঠনের প্রাথমিক শক্তি আসে এই আসাবিয়া থেকে। যাযাবরদের মধ্যে রক্ত সম্পর্ক ও বিপদে একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা থেকেই এই শক্তির জন্ম।
- ধর্ম এই আসাবিয়াকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। খালদুনের মতে, আসাবিয়ার সাথে যখন ধর্মীয় আদর্শ যুক্ত হয়, তখন সেই গোষ্ঠী অপরাজেয় শক্তিতে পরিণত হয় (যেমন ইসলামের প্রাথমিক যুগের বিজয়)।
- কিন্তু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর শাসক যখন একনায়ক হয়ে ওঠেন এবং নিজের গোত্রের বদলে ভাড়াটে সৈন্য বা আমলাদের ওপর নির্ভর করতে শুরু করেন, তখন আসাবিয়া ভেঙে পড়ে এবং রাষ্ট্রের পতন ত্বরান্বিত হয়।
রাষ্ট্রের আয়ুষ্কাল ও চক্রাকার আবর্তন (Cyclical Theory)
ইবনে খালদুন বিশ্বাস করতেন, মানুষের মতো রাষ্ট্রেরও একটি নির্দিষ্ট আয়ুষ্কাল আছে। তিনি একটি রাজবংশের গড় আয়ুষ্কাল ১২০ বছর বা তিন প্রজন্ম বলে উল্লেখ করেছেন:
- প্রথম প্রজন্ম: এরা মরুভূমির কঠোরতা থেকে উঠে আসা সাহসী ও সংহতিপূর্ণ গোষ্ঠী। তারা রাজ্য জয় করে এবং শাসন প্রতিষ্ঠা করে।
- দ্বিতীয় প্রজন্ম: এরা ক্ষমতা ভোগ করে কিন্তু তাদের পিতৃপুরুষের সংগ্রামের কথা মনে রাখে। তারা কিছুটা বিলাসী হয় কিন্তু একদম অকেজো হয় না।
- তৃতীয় প্রজন্ম: এরা পুরোপুরি বিলাসিতায় ডুবে থাকে। মরুভূমির কঠোরতা তারা দেখেনি। তারা রাষ্ট্র পরিচালনায় অক্ষম হয় এবং এদের সময়েই রাষ্ট্রের পতন ঘটে।
রাষ্ট্রের পতনের এই প্রক্রিয়াটি পাঁচটি ধাপে সম্পন্ন হয় বলে তিনি উল্লেখ করেন: ১. বিজয়, ২. একচ্ছত্র আধিপত্য, ৩. বিলাসিতা ও জাঁকজমক, ৪. সন্তুষ্টি ও স্থবিরতা, এবং ৫. অপব্যয় ও পতন।
অর্থনৈতিক দর্শন: কর ব্যবস্থা ও মূল্যস্ফীতি
ইবনে খালদুন আধুনিক অর্থনীতির অনেক সূত্র (যেমন জোগান ও চাহিদা, মূল্যতত্ত্ব) তার গ্রন্থে আলোচনা করেছেন। তার কর বা ট্যাক্সেশন বিষয়ক তত্ত্বটি বর্তমানে ‘ল্যাফার কার্ভ’ (Laffer Curve) নামে পরিচিত। তিনি বলেন:
- রাষ্ট্রের শুরুতে: করের হার থাকে কম, কিন্তু করদাতার সংখ্যা বেশি থাকায় রাজস্ব আয় হয় প্রচুর। মানুষ উৎসাহ নিয়ে ব্যবসা করে।
- রাষ্ট্রের শেষের দিকে: শাসকের বিলাসিতা মেটাতে করের হার অত্যধিক বাড়ানো হয়। ফলে মানুষ ব্যবসায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলে, উৎপাদন কমে যায় এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের মোট রাজস্ব আয় কমে যায়।
এছাড়া তিনি সরকারকে সরাসরি ব্যবসায় জড়াতে নিষেধ করেছেন, কারণ এতে সাধারণ ব্যবসায়ীরা অসম প্রতিযোগিতায় পড়ে ধ্বংস হয়ে যায়।
জ্ঞানতত্ত্ব: ধর্ম ও বিজ্ঞানের সীমারেখা
ইবনে খালদুন জ্ঞানকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন:
- নকলি বা ঐতিহ্যগত জ্ঞান: কুরআন, হাদিস, ফিকহ—যা ওহীর মাধ্যমে প্রাপ্ত।
- আকলি বা বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞান: দর্শন, গণিত, পদার্থবিদ্যা—যা মানুষের চিন্তার ফসল।
তিনি বিশ্বাস করতেন, বুদ্ধিবৃত্তির একটি নির্দিষ্ট সীমা আছে। সৃষ্টিকর্তার সত্তা, পরকাল বা অতীন্দ্রিয় বিষয়গুলো মানুষের যুক্তি দিয়ে বোঝা সম্ভব নয়। তাই তিনি অধিবিদ্যা (Metaphysics), জাদুবিদ্যা, আলকেমি বা ভবিষ্যৎ গণনাকে ‘অপ্রয়োজনীয়’ ও বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞান হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার মতে, বিজ্ঞানের কাজ হলো জাগতিক সমস্যার সমাধান করা, ঐশ্বরিক রহস্য ভেদ করা নয়।
শেষ কথা হল— প্রায় সাতশো বছর আগে ইবনে খালদুন যে সমাজ ও রাষ্ট্রকাঠামোর বিশ্লেষণ করে গেছেন, তা আজকের আধুনিক সমাজেও প্রাসঙ্গিক। রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক মন্দা, শাসকগোষ্ঠীর সাথে জনগণের দূরত্ব এবং বিলাসিতার কারণে সভ্যতার পতন—এসব কিছুই খালদুনের তত্ত্বে নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে। বিংশ শতাব্দীর বিখ্যাত ঐতিহাসিক আর্নল্ড টয়েনবি যথার্থই বলেছেন, “ইবনে খালদুন যে ইতিহাসের দর্শন রচনা করেছেন, তা নিঃসন্দেহে যেকোনো যুগে, যেকোনো স্থানে মানুষের সৃষ্ট সর্বশ্রেষ্ঠ কাজগুলোর একটি।”
তথ্যসূত্র ও সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি:
১. ইবনে খালদুন, আল-মুকাদ্দিমা (ইংরেজি অনুবাদ: ফ্রাঞ্জ রোজেন্থাল, প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৬৭)।
২. টয়েনবি, আর্নল্ড জে., এ স্টাডি অফ হিস্ট্রি, খণ্ড ৩।
৩. লাকোস্ট, ইভস, ইবনে খালদুন: দ্য বার্থ অফ হিস্ট্রি অ্যান্ড দ্য পাস্ট অফ দ্য থার্ড ওয়ার্ল্ড।
৪. ডা. মো. মোস্তাফিজুর রহমান, ইবনে খালদুনের সমাজচিন্তা, বাংলা একাডেমি।
৫. গেটস, ওয়ারেন ই., দ্য ইকোনমিক ব্যাকগ্রাউন্ড টু ইবনে খালদুনস পলিটিক্যাল থিওরি।
৬. এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা, ইবনে খালদুন অধ্যায়।

