Wednesday, July 29, 2026
26.1 C
Bangladesh

কংক্রিটের জঙ্গলে সৈকতের রাজ্য

কক্সবাজার মানেই উত্তাল সমুদ্রের গর্জন আর দিগন্তজোড়া নীল জলরাশি। এখানে সূর্যাস্ত মানেই আকাশে রঙের খেলা। গোধূলির আলো যখন সমুদ্রের ঢেউয়ের ওপর পড়ে, তখন পুরো সৈকত সোনালীতে ভরে যায়। এই দৃশ্য দেখার জন্য হাজারো মানুষ প্রতিদিন ভিড় জমায়। বিশ্বের দীর্ঘতম এই অবিচ্ছিন্ন বালুকাময় সমুদ্র সৈকত কেবল একটি পর্যটন কেন্দ্র নয়, বরং এটি প্রকৃতির এক অপার বিস্ময়। সবকিছু মিলিয়ে একটি আদর্শ ছুটির গন্তব্য হিসেবে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে অবস্থিত কক্সবাজারকে গড়ে তোলার সবকিছুই রয়েছে সেখানে।

প্রায় ১২০ (৭০ মাইল) কিলোমিটার দীর্ঘ এই সৈকতে দাঁড়ালে মনে হয় সমুদ্রের কোনো শেষ নেই। ঝাউবনের ছায়া আর পায়ের নিচে নরম বালুর স্পর্শ মুহূর্তেই মন ভালো করে দেয়। লাবণী, সুগন্ধা বা কলাতলী—প্রতিটি পয়েন্টের রয়েছে নিজস্ব আমেজ। কোথাও আবার বালুকাময় সৈকতের কোল ঘেষে ছুটে চলা মেরিন ড্রাইভের পাকা সড়কের পাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে নিজের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে গাড়ো সবুজ পাহাড়। সমুদ্রের সৌন্দর্য ছাড়াও এখানকার স্থানীয় রাখাইন সংস্কৃতির ছোঁয়া পর্যটনে ভিন্ন মাত্রা যোগ করে।

এছাড়াও ইনানী সৈকতের প্রবাল পাথর আর স্বচ্ছ নীল পানি অনেকটা সেন্ট মার্টিন্সের আমেজ দেয়। ভাটার সময় পাথরের ওপর বসে সমুদ্র দেখা সত্যিই জাদুকরী এক অনুভূতির জন্ম দেয়।

যেহেতু বঙ্গোপসাগরের এই দীর্ঘ উপকূলরেখা খুব কমই অন্বেষণ করা হয়েছে, তাই অনেকের মনেই ধারণা আসে এই সৈকত থাইল্যান্ডের পাতায়া বা শ্রীলঙ্কার গ্যালের মতো এই সাথে প্রতিযোগিতা করার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু দেশীয় পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় হলেও স্থানীয় পরিবেশগত কারণ এবং সঠিক রক্ষণশীলতা না থাকায় বহিঃবিশ্বের পর্যটকরা সেভাবে আকর্ষণের কেন্দ্রে পৌছাতে পারছেনা। যার ফলে বিদেশী পর্যটকদের আগমন সেরকম নেই বললেই চলে।

এই গ্রীষ্মমন্ডলীয় স্বর্গরাজ্যটি ঘিরে বাংলাদেশ সরকারের নতুন পরিকল্পনার মূল চাবিকাঠি হওয়া উচিত। বর্তমানে যে পরিমাণ দেশীয় পর্যটকদের আগমন হয় একটি আদর্শ ছুটির গন্তব্য হিসেবে এখানে তার ১০ শতাংশ বিদেশি পর্যটকের আগমন হলে আগামীতে পর্যটন থেকে ১০ বিলিয়ন ডলার বা এর বেশিও আয় করতে পারবে বাংলাদেশ সরকার।

সৈকত এলাকা দখল করে সেখানে শত শত ভবন তৈরি হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে যা পরিবেশের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে নির্মিত অনেক হোটেল, সরকারি ভবন এবং দোকানের যথাযথ পরিকল্পনার অনুমতি নেই। পর্যটন অবকাঠামো নির্মাণের নামে সৈকতের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা দেয়াল হিসেবে পরিচিত ঝাউবন কেটে ফেলা হচ্ছে। ফলে সমুদ্রের জোয়ারে সৈকতে তীব্র ভাঙন দেখা দিচ্ছে। কক্সবাজারের মূল সৈকত দেখলে বোঝা যায় যে কর্তৃপক্ষ দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে আন্তর্জাতিক পর্যটন আকর্ষণের উচ্চাকাঙ্ক্ষী স্বপ্ন শুধু স্বপ্নের মাঝেই রূপ নিয়ে থাকবে বাস্তবতার ছোঁয়া পাবেনা কখনোই।

প্রায় দুই দশক আগে পর্যন্ত, কক্সবাজার ছিল একটি ঘুমন্ত সমুদ্র সৈকতের শহর। ঢাকা কিংবা চট্টগ্রামের মতো বড় শহরগুলির শব্দ এবং দূষণ থেকে স্বস্তির নিশ্বাস নিতে বছরের একটা নির্দিষ্ট সময় মানুষের আকর্ষনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই সৈকতের শহর। একটা সময় যা বেশিরভাগ বাংলাদেশিদের আকর্ষণ করত। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সৈকতের যত্রতত্র স্থাপনা ও রাতের বেলা অতিরিক্ত আলোকসজ্জার কারণে সামুদ্রিক কচ্ছপের ডিম পাড়ার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। লাল কাঁকড়া এবং বিরল প্রজাতির সামুদ্রিক জীবের আবাসস্থলও আজ হুমকির মুখে।

তবে, দুই দশকের দৃশ্যপট বিবেচনায় অপরিকল্পিত উন্নয়ন কাঠামোয় পুরো ভূদৃশ্য বদলে গেছে এবং এলাকায় শত শত হোটেল ভবন, অ্যাপার্টমেন্ট ব্লক এবং রেস্তোরাঁ গড়ে উঠেছে। এছাড়াও মূল সৈকতে কোল ঘেষে গড়ে উঠেছে স্মারক, খেলনা, পোশাক এবং ফাস্ট ফুড বিক্রি করে এমন শত শত দোকান। অধিকাংশ হোটেল-মোটেলের নিজস্ব STP (Sewage Treatment Plant) নেই। ফলে হোটেল ও শহরের বর্জ্য সরাসরি নালা দিয়ে সমুদ্রে গিয়ে মিশছে, যা সমুদ্রের পানিকে বিষাক্ত করে তুলছে। অতিরিক্ত পর্যটকের চাপে প্রতিদিন সৈকতে বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য জমা হচ্ছে। চলতি বছরের (২০২৬) শুরুতেও এক ঘণ্টা পরিষ্কার অভিযানে প্রায় ২৫০ কেজি প্লাস্টিক বর্জ্য সংগৃহীত হওয়ার মতো চিত্র দেখা গেছে।

পরিবেশবিদদের আশঙ্কা, যদি মূল সৈকতের পাশে অবৈধভাবে নির্মিত ভবনগুলি শীঘ্রই অপসারণ না করা হয়, তাহলে এলাকাটি আর কখনও পুনরুদ্ধার সম্ভব হবেনা এবং কক্সবাজার চিরতরে হারাবে তার মূল সোন্দর্য।

সূত্রে পাওয়া তথ্য বলছে, বিগত বছরগুলোতে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত থেকে উচ্চ আদালত বিভিন্ন সময়ে অবৈধ স্থাপনা ভেঙে ফেলার নির্দেশ দিলেও অনেক ক্ষেত্রেই প্রভাবশালী মহলের কারণে তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয় না। সূত্র বলছে মূল সমস্যা হল সমুদ্র সৈকত এলাকায় অনেক সরকারি ভবনও নির্মিত হয়েছে যে কারণে এই কার্যক্রম সাফল্যের মুখ দেখছেনা। তবে সম্প্রতি (জানুয়ারি ২০২৬) হাইকোর্ট সৈকতের “প্রাকৃতিক চরিত্র” রক্ষায় কঠোর নির্দেশ জারি করেছেন।

এছাড়াও পর্যাপ্ত রাস্তা, ড্রেনেজ এবং খোলা জায়গা ছাড়াই কক্সবাজার শহর একটি ‘কংক্রিটের জঙ্গলে’ পরিণত হয়েছে। পর্যটন মৌসুমে এই যানজট ভয়াবহ রূপ নেয়।

এসংক্রান্ত বিভিন্ন মন্তব্য বিশ্লেষণে পাওয়া তথ্যে দেখা যায় বিগত বছর গুলোতে বাংলাদেশের সাবেক পর্যটনমন্ত্রী মন্ত্রী থেকে শুরু করে উচ্চপদস্থ বেশ কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন যে কক্সবাজারে কিছু অপরিকল্পিত উন্নয়ন বৃদ্ধি ঘটেছে এবং সেই সাথে এই অঞ্চলটি রক্ষার জন্য কার্যকরী কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত মেরিন ড্রাইভ সড়কের সমুদ্র সৈকতের দক্ষিণ দিকে কোনো প্রকার ভবন বা স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও দেখা যায় সেখানে শত শত নতুন ভবন ও অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। যা কেবল সমুদ্র তীরেই সীমাবদ্ধ নয় মেরিন ড্রাইভের সড়কের কাছাকাছি পাহাড়গুলিকেও হুমকির সম্মুখীন করেছে।

অবকাঠামো উন্নয়নের লক্ষ্যে পাহাড়ের ধারে নির্বিচারে গাছ কাটা হচ্ছে এবং ভবন তৈরির জন্য জমিও পরিষ্কার করা হচ্ছে। যার ফলস্বরূপ, বর্ষাকালে আমরা ঘন ঘন ভূমিধসে বহু লোকের প্রাণহানি দেখি। জুন মাসে ভারী বৃষ্টিপাতের সময় মাটির তীর ধসে মানুষ মারা যায়, ঘরবাড়ি মাটি চাপা পড়ে।

স্থানীয় অনেক বাসিন্দা ও বেশ কয়েকজন কর্মচারীদের থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী অনেক পর্যটক প্রবালকে স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে বাড়িতে নিয়ে যান। ফলস্বরূপ, ব্যবসায়ী এবং স্থানীয়রা প্রায়শই  সেন্ট মার্টিনের মতো নিকটবর্তী দ্বীপ থেকে প্রবাল এবং সমুদ্রের খোলস সংগ্রহ করেন।

কক্সবাজারের বর্তমান জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল মান্নান জানান, সরকার কক্সবাজার সংরক্ষণের জন্য একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে। পরিকল্পিত কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এই অঞ্চলে সমস্ত নতুন ভবন নির্মাণ তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ করবে। কিন্তু স্পষ্ট নয় যে কেবল কক্সবাজারকে বাঁচাতে এটা যথেষ্ট হবে কিনা। বর্তমানে সরকার এবং আইএলও (ILO) মিলে ‘Destination Development Plan for Cox’s Bazar (2025-2027)’ নামে একটি নতুন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে পরিবেশবান্ধব পর্যটন (Eco-tourism) নিশ্চিত করা, ​পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, ​অবৈধ দখলদার মুক্ত করে সৈকতের আদি রূপ ফিরিয়ে আনা। এতে করে আগামীতে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে।

কক্সবাজার শুধু একটি পর্যটন কেন্দ্র নয়, এটি একটি জীবন্ত ইকোসিস্টেম। এই সৌন্দর্য টিকিয়ে রাখতে উন্নয়নের চেয়ে সংরক্ষণে বেশি জোর দেওয়া প্রয়োজন।

জনপ্রিয়

More like this
Related

শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী (রহঃ) : জীবন ও তৎপরতার সংক্ষিপ্ত রূপ

আরেফিন আল ইমরান সংক্ষিপ্ত আলোচনার মাধ্যমে একজন মহত্তম ব্যক্তিকে তুলে...

বাজার অস্থিরতা: কম্পিউটার এক্সেসরিজের হঠাৎ করে লাগামহীন দাম কেন? কবে ফিরবে স্বাভাবিক দামে ?

দেশের বাজারে কম্পিউটার এক্সেসরিজ বা ইলেকট্রিক পণ্যের বাজার হঠাৎ...

বিশ্বজুড়ে চিনির বিকল্প হিসেবে জনপ্রিয় হচ্ছে,ওষুধি গাছ ‘স্টেভিয়া’

অ্যাস্টার পরিবারের (Asteraceae) ফুলের উদ্ভিদ যা হচ্ছে স্টেভিয়া, (Stevia...