সংস্কৃতি কি? এই প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে গেলে “সংস্কৃতি” বলতে আমরা বুঝি পরিশিলিত চিন্তা; রুচি এবং আচরণ। এর সঙ্গে যুক্ত ক্রমাগত অভ্যাস বা অনুশীলনের দ্বারা অর্জিত মনের উৎকর্ষতা। এছাড়াও সহজ ভাষায় “সংস্কৃতি” বলতে আমরা বুঝি, একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের মানুষের খাদ্যের অভ্যাস, শিক্ষা,জীবিকা নির্বাহের উপায়, সংগীত, সাহিত্য এবং সামাজিক সম্পর্কের মাধ্যমে যে অভিব্যক্তি প্রকাশ করা হয় তাই “সংস্কৃতি”।
ইংরেজিতে “কালচার” শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে অতীত কাল সূচক লাতিন ক্রিয়াপদ “Colere”থেকে যার অর্থ হলো চাষ করা। শব্দটির বর্তমান ব্যবহার মধ্যযুগের ফরাসী এবং মধ্য ইংরেজি (১১০০-১৪৫০) থেকে। মধ্য ইংরেজিতে “Culture” শব্দটির অর্থ ছিল কর্ষিত ভূমি খন্ড। আধুনিক অর্থে প্রত্যয়টির বিকাশ ঘটে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষার্ধ থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধের মধ্যে।১৯২২ সালে ইংরেজি “Culture”-এর প্রতিশব্দ হিসেবে বাংলায় প্রথম সংস্কৃতি শব্দটি ব্যবহৃত হয়। বাংলায় কালচার অর্থে মারাঠি ভাষা থেকে নেওয়া ‘সংস্কৃতি’ এই শব্দটি সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় প্রস্তাব করলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সর্বপ্রথম এর অনুমোদন দেন।
‘সংস্কৃতি’র সংজ্ঞার ক্ষেত্রে, ১৯ শতকের ইংরেজ নৃবিজ্ঞানী এডওয়ার্ড বার্নেট টাইলার তার” প্রিমিটিভ কালচার” (১৮৭১) এর প্রথম অনুচ্ছেদে _সংস্কৃতির ধ্রুপদী সংজ্ঞা যাকে বলা হয়েছে তা প্রদান করেছেন:
“সংস্কৃতি… হল সেই জটিল সমগ্র যার মধ্যে জ্ঞান, বিশ্বাস, শিল্প, নীতি, আইন, রীতিনীতি এবং সমাজের সদস্য হিসেবে মানুষ যে কোনও ক্ষমতা এবং অভ্যাস অর্জন করে।”
পরবর্তীতে, (১৮৮১) সালে নৃবিজ্ঞানী টাইলার স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে,”সংস্কৃতি”এইভাবে সংজ্ঞায়িত, কেবল মানুষেরই অধিকারে এবং “সংস্কৃতির”এই ধারণাটি প্রায় ৫০ বছর ধরে নৃবিজ্ঞানীদের ভালোভাবে সেবা করেছে।
এরপর, প্রায় ৭১ বছর পর ১৯৫২ সালে, মার্কিন নৃবিজ্ঞানী এ.এল. ক্রোবার এবং ক্লাইড ক্লুকহোন “Culture: A Critical Review of Concepts and Definitions” (১৯৫২) বইতে সংস্কৃতির ১৬৪টি সংজ্ঞা উদ্ধৃত করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে “শিখানো আচরণ” থেকে শুরু করে “মনের ধারণা,” “একটি যৌক্তিক গঠন,” “একটি পরিসংখ্যানগত কল্পকাহিনী,” “একটি মানসিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা” ইত্যাদি। ক্রোবার এবং ক্লুকহোন এবং আরও অনেক নৃবিজ্ঞানী সংস্কৃতির যে সংজ্ঞা – বা ধারণা – পছন্দ করেন তা হল সংস্কৃতি হল একটি বিমূর্ততা বা, আরও স্পষ্টভাবে, “আচরণ থেকে একটি বিমূর্ততা”।কিন্তু প্রকৃতপক্ষে,”সংস্কৃতির” এই সংজ্ঞা মনোবিজ্ঞানের বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে; অতএব, তারা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে সংস্কৃতি “মূর্ত আচরণ থেকে একটি বিমূর্ততা কিন্তু নিজেই আচরণ নয়।” কিন্তু, কেউ কি জিজ্ঞাসা করতে পারে, বিবাহ অনুষ্ঠান বা মৃৎশিল্পের বাটির বিমূর্ততা, ক্রোবার এবং ক্লুকহোনের উদাহরণ ব্যবহার করলে? এই প্রশ্নটি এমন অসুবিধা তৈরি করে যা এই লেখকরা পর্যাপ্তভাবে পূরণ করতে পারেননি।
পরবর্তীতে, লেসলি এ. হোয়াইট সম্ভবত “সংস্কৃতির ধারণা” (1959) প্রবন্ধে একটি সমাধান প্রদান করেছিলেন। তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন যে, সমস্যাটি আসলে “সংস্কৃতি” বাস্তব নাকি বিমূর্ততা; সমস্যাটি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার প্রেক্ষাপট।
উপরিউক্ত, সংজ্ঞাগুলো থেকে আমরা বিশ্লেষণ করে পাই যে “সংস্কৃতি”হল, প্রতীকীকরণের উপর নির্ভরশীল জিনিস এবং ঘটনার একটি শ্রেণীর নাম (অর্থাৎ, স্পষ্ট বক্তৃতা) যা এক ধরণের অতিরিক্ত মানবিক প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করা হয়।

