হুমায়ূন আহমেদ বিভিন্ন ধরনের উপন্যাস লিখেছেন কিংবা তাকে লিখতে হয়েছে। জনপ্রিয়তার জন্য যেমন লিখেছেন, তেমনি নিখাদ সাহিত্যও লিখেছেন। মেঘ বলেছে যাব যাব, অপেক্ষা, জোছনা ও জননীর গল্প—সবাই লিখতে পারেনা। তার গল্প বলার নিজস্ব একটা স্টাইল আছে, যেটাকে প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাক—ভীষণ মিষ্টি বলে মনে করতেন। তিনি চরিত্র সৃষ্টি করতে পারতেন। আশি বা নব্বই দশকের বাঙালি মধ্যবিত্তের সমাজ ও পরিবার বুঝতে হুমায়ূন অপরিহার্য। উৎপ্রেক্ষা, অনুপ্রাস এসবও তার রচনায় আছে। বিশ্ব সাহিত্যে পরিভ্রমণ ও বিজ্ঞান জানাটা তার জন্য খুব সহায়ক হয়েছিল। অন্যদের মত কঠিন ভাষায় না লিখে, সহজ ভাষায় লেখার জন্য অনেকেই তাকে খুব তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে। অথচ তার সমকালীন, আহমদ ছফা, সৈয়দ শামসুল হক, সুনীল, সমরেশ, শীর্ষেন্দু সবাই তার গুরুত্ব স্বীকার করেছেন। সেটা বই বিক্রি থেকে, জনপ্রিয়তা লাভ কিংবা সাহিত্য আলোচনায় প্রাসংগিক থাকা অবধি সবক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। দেশ পত্রিকা টানা আট সংখ্যায় তার লেখা ছাপিয়েছে। শরতের পর সবচেয়ে জনপ্রিয় হওয়াটাও নেহায়েত ফেলনা নয়। এখন অবধি অনেকেই তার ভাব ও ভাষাকে অনুসরণ করে আরেকজন হুমায়ূন হতে চাইছেন, কিন্তু বাস্তবে তা ঘটছেনা। এনিওয়ে, কেউই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। হুমায়ুনেরও সীমাবদ্ধতা ছিল। তাই বলে তিনি সাহিত্যিক নন, এটা বলাটা অবিচার হয়ে যায়। সবাই টলস্টয়, দস্তয়ভস্কি কিংবা শেকসপিয়র হয়না। সাহিত্য রাজ্যে এমন ধরা বাধা কোনো নিয়ম নেই। ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ থাকতেই পারে। আমারা আজ ৪টি বৈশিষ্ট্যের আলোকে হুমায়ূনকে বিশ্লেষণ করবো, যেখানে তিনি অন্যদের চেযে ব্যতিক্রম।
১) স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে শিল্প-সাহিত্যের যে রূপান্তর ঘটল—সেটার অভিমুখ ছিল ভারতমুখী। সেই বঙ্কিম-রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে বুদ্ধদেব, বিষ্ণু দে, অমিয়, প্রেমেন্দ্র, তিন বন্দোপাধ্যায়সহ সত্যজিতের সব সাহিত্যই দিল্লী ও কলকাতার পটভূমিতে প্রতিপালিত। সেখানে ঘটনা, চরিত্র এবং সামগ্রিক সংস্কৃতিই হিন্দু ধর্ম ও কলকাতার সমাজের আবহে রচিত। বাংলাদেশের মুসলিম সমাজের জন্য পৃথক একটা সাহিত্যিক পরিমন্ডল গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছিল ভীষণভাবে। এজন্য হুমায়ূন কৃতিত্বের দাবীদার। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ, সৈয়দ শামসুল হক, হাসান আজিজুলসহ অনেকেই প্রগতিশীলতার যে মোড়ক হাজির করেছিলেন—সেখানে মুসলমানদের স্বাতন্ত্র্যবোধকে ভালোভাবে পরিস্ফুট নয়। হুমায়ূন অনায়াসে মুসলিম নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্তদের নিয়ে কাজ করেছেন। সেখানে কোনো জড়তা বা প্রগতিশীলতার ভড়ং ছিলনা। তার উপন্যাস যে বাংলাদেশের মুসলিম সমাজের প্রতিনিধিত্ব করে, এটা যারা একটু গভীরভাবে তাকে স্টাডি করেছেন, তারা অবশ্যই উপলব্ধি করতে পারবেন।
২) মুুক্তিযুদ্ধের প্রগতিশীল বয়ানকে হুমায়ূন আহমেদ তার সাহিত্য, নাটক ও চলচ্চিত্রে উৎপাটন করেছেন। ধার্মিক মুসলমান মানেই স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তি, দাড়ি-টুপিওয়ালা মানেই রাজাকার-আলবদর—এই প্রিডেটারমাইন্ড ফ্যালাসি থেকে হুমায়ূন তার সাহিত্যকে মুক্ত করেছিলেন। প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিক এবং বুদ্ধিজীবীদের মধ্য হুমায়ুন আহমেদই কেবল ব্যতিক্রম। ‘শ্যামল ছায়া’ উপন্যাস পড়ুন বা চলচ্চিত্রটি দেখুন। প্রগতিশীল বয়ানের বাইরে মুক্তিযুদ্ধের আরেক স্বরূপ আপনার কাছে হাজির হবে। এরকম আরো অনেক জায়গায় তিনি প্রগতিশীল মোর্চার বিরুদ্ধে সুস্পষ্টভাবে অবস্থান নিয়েছেন।
৩) সত্তর-আশির দশক থেকে সুনীল-সমরেশ-শীর্ষেন্দু, সূচিত্রা, বুদ্ধদেব গুহ প্রমুখের যে জনপ্রিয়তা ও দাপট সেটার বিরুদ্ধে হুমায়ূন আহমেদই ছিলেন বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ আবিষ্কার। পূর্ব বাংলার মাটির সংস্কৃতি এবং মুসলিম সংস্কৃতির সংমিশ্রণে বাংলা সাহিত্যে তিনি এক নতুন ধারার বিপ্লব ঘটান। হুমায়ুন আহমেদ তার সাহিত্যে বাংলাদেশী মুসলিম সংস্কৃতির মাহাত্ম্য দেখিয়েছেন বলেই এখানকার দিল্লী ও কলকাতাপন্থী প্রগতিশীলরা তাকে নিম্নমানের সাহিত্যিক বলে প্রোপাগান্ডা চালিয়েছেন। তাকে এখনও তাকে—বাজারে লেখক, জনপ্রিয়তা সাহিত্যের মানদন্ড নয়, পাঠক তৈরী তার কাজ নয়—এসব বলে খাটো করার তুমুল চেষ্টা চলে। কিন্তু মজার বিষয় হল—এই প্রোপাগান্ডার পরও হুমায়ুন আহমেদই সফল হয়েছেন। অন্য প্রগতিশীলরা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন আর হুমায়ূন তুমুল শক্তিতে মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়েছেন। সেটা এতোটাই যে, শরৎচন্দ্র ছাড়া বাংলা সাহিত্যে যার কোনো নজির নেই। এদেশের ভাব-ভাষা-সংস্কৃতি ও মুসলমানিত্বকে ঘিরে যে সাহিত্যটা তিনি দাঁড় করিয়েছেন সেটার প্রভাব খুব সহজেই ম্রীয়মান হওয়ার নয়।
৪) ইউরোপের বরকন্দাজী, কলকাতার বরকন্দাজীর বাইরে ভালো-মন্দ-ভন্ডামির মিশেলে আমাদের যে সমাজ—সেটার বিশ্বস্ত প্রতিনিধি হিসেবে হুমায়ূন আহমেদ সার্থক। তার সাহিত্যিক দুর্বলতা-সবলতা আলাদা বিষয়। কিন্তু ঔপনিবেশিক সাহিত্য, ভারতীয় হিন্দু সমাজনির্ভর সাহিত্যের বাইরে আলাদা পরিসর গড়ে তোলার ক্রেডিট আপনার হুমায়ূনকে দিতেই হবে। তার লড়াইটা সহজ ছিলনা। আজো নয়। চাইলেই যদি হুমায়ূন হওয়া যেত তাহলে ইমদাদুল হক মিলন, আনিসুল হক, সুমন্ত আসলাম বা সাদাত হোসাইনরা বহু আগেই সেটা হয়ে যেতেন।

