আর্যদের আদি বাসভূমি : আর্য জাতির আদি বাসস্থান নিয়ে ইতিহাসবিদদের মাঝে মতভেদ রয়েছে। ম্যাক্স মুলারের ভাষায়—‘পশ্চিম এশিয়া থেকে আর্যদের একটি দল এশিয়া মাইনরের ভেতর দিয়ে ইউরোপে অনুপ্রবেশ করে। আর অন্য দলটি উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে আসে।’ ম্যাক্স মুলারের এই চিন্তা প্রাথমিকভাবে গৃহীত হলেও পরে পরিত্যাজ্য হয়। অধ্যাপক ম্যাকডোনাল ও গিল এর মতে,‘বর্তমান হাঙ্গেরি, অস্ট্রিয়া ও চেকোশ্লোভাকিয়া নিয়ে ইউরোপের যে অঞ্চল গঠিত—সেটাই ছিল আর্যদের আদি বাসস্থান।’ এ বিষয়ে প্রখ্যাত ঐতিহাসকি রমেশ চন্দ্র মজুমদার বলেন—‘দক্ষিণ রাশিয়া ছিল আর্যদের আদি ভূমি।’ এ নিয়ে ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের আরো অনেক মতামত রয়েছে। তবে সেসবের আলোকে এটা পরিষ্কার যে, আনুমানিক খ্রীস্টপূর্ব ২০০০ অব্দে পূর্ব ইউরোপের পোল্যান্ড থেকে মধ্য এশিয়া পর্যন্ত যে বিস্তীর্ণ তৃণভূমি অঞ্চলে আর্যরা বসবাস করত। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অভ্যন্তরীন কলহ, খাদ্যের অভাব প্রভৃতি সমস্যা দেখা দিলে, তারা নিজেদের আদিভূমি ত্যাগ করে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ে। তাদের একটি শাখা প্রাচীন পারস্যে চলে যায়। সেদিক থেকে বর্তমান ইরানীরাও এই আর্যজাতির বংশধর। অপর একটি শাখা একটি শাখা উত্তর-পশ্চিম গিরিপথ দিয়ে ভারতে প্রবেশ করে। ক্যাপাডশিয়ায় প্রাপ্ত ‘বোখাজ কোষ’ শিলালিপি থেকে জানা যায়— ‘খ্রীস্টপূর্ব ১৪০০ অব্দে ভারতের উত্তরাঞ্চলের ‘মিঠালী’ নামক অধিবাসীদের উপর প্রভাব বিস্তার করে।’ তা থেকে এটা অনুমান করা যায় যে, খ্রীস্টপূর্ব ১৪০০-১৫০০ অব্দে আর্যরা ভারতে অনুপ্রবেশ করে।
আর্যদের ধর্ম বিশ্বাস : আর্যদের যে পরিচয় পাওয়া যায় তা হতে পরিষ্কার হয় যে আর্যদের ধর্মীয় বিশ্বাস ছিল সহজ ও সরল।আর্যগণ প্রকৃতির রূপ দেখে ও বিস্মিত হয়েছেন, দেবতার কল্পনা করেছেন। তাদের উপাস্য দেবতা ছিলো আলোর দেবতা সূর্য, আকাশের দেবতা দ্যৌঃ, বায়ুর দেবতা মরুৎ, জলের দেবতা বরুণ, বৃষ্টি ও বজ্রের দেবতা ইন্দ্র। ইন্দ্র ও বরুণ ছিলেন দেবতাগণের মধ্যে প্রধান। উষা, সরস্বতী, পৃথিবী প্রমুখ দেবীর উল্লেখও ঋগ্বেদে আছে। আর্যরা ছিলেন মূলতঃ প্রকৃতির উপাসক। আর্যরা মনে করতেন সকল দেবতাই এক অদ্বিতীয় মহাশক্তির বিভিন্ন রূপ। উপনিষদে এই এক ব্রহ্ম চিন্তারই প্রধান্য ঘটেছে। আর্যগণ অগ্নিকুণ্ড প্রজ্বলিত করে দুগ্ধ,ঘৃত প্রভৃতি প্রিয় আহার্য উপাস্য দেবতাকে নিবেদন করার প্রাক্কালে বৈদিক মন্ত্রও পাঠ করতেন। বেদের ব্রাহ্মণ অংশ যখন রচিত হয় তখন যজ্ঞ ক্রিয়ার নানা জটিলতা দেখা দেয় এবং বৈদিক মন্ত্রাদিতে জ্ঞান সম্পন্ন এক শ্রেণীর লোকের উদ্ভব হয়। এই শ্রেণীর পুরোহিত, যাদের প্রাধান্যে বৈদিক ধর্মের আন্তরিকতার লুপ্ত হয়ে যাগ যজ্ঞের ক্রিয়াকলাপই মূখ্য হয়ে দেখা দেয়।
উপরোক্ত, আলোচনা থেকে এটা পরিষ্কার যে আর্যরা আগে থেকেই প্রকৃতির বিভিন্ন রূপের উপাসনা করত। তারা মূলত একেশ্বরবাদী হলেও, ঈশ্বরের বিভিন্ন রূপ হিসেবে অনেক দেব-দেবীর উপাসনায় লিপ্ত ছিল। আর ভারতবর্ষে আসার পর, তাদের ধর্মীয় চিন্তায় বেশ কিছু পরিবর্তন দেখা যায়। দ্রাবিড় ও সিন্ধু সভ্যতার অনেক রীতি-নীতি তাদের মাঝে অনুপ্রবেশ করে। প্রাচীন বৈদিক যুগে তারা মূর্তিপূজা করতনা। কিন্তু কালক্রমে ভারতের অন্যান্য অধিবাসীদের কাছ থেকে তারা মূর্তিপূজা শুরু করে। এক্ষেত্রে অনার্য দেব-দেবীরাও আর্যদের উপাস্য হয়ে উঠেছেন। প্রথম দিকে পূজা-অর্চনা ও যাগ-যজ্ঞের বিধান সেভাবে ছিলনা। পরবর্তীতে অনেক রীতি-নীতি ও যাগ-যজ্ঞের আড়ম্বরে আর্যদের ধর্মীয় চিন্তা ক্রমেই কঠিন রূপ ধারণ করে। এর ফলে গৌতম বুদ্ধ, পার্শ্বনাথ, মহাবীর প্রমুখদের মাধ্যমে খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে ভারতবর্ষে বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের উত্থান ঘটে। একে ঐতিহাসিকরা ধর্মীয় বিপ্লবের যুগ হিসেবে আাখ্যায়িত করেছেন।
বেদ সংক্রান্ত আলোচনা : ‘বেদ’ শব্দটি ‘বিদ’ তথা জ্ঞান থেকে উৎপন্ন। এটি প্রাচীন সংস্কৃত ভাষায় রচিত। বেদ ও অপরাপর বৈদিক সাহিত্যগুলি আনুমানিকভাবে খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০-১০০০ অব্দের মধ্যে রচিত বলে মনে করা হয়। বেদ সমগ্র বিশ্ব সাহিত্যে একটি বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছে। বেদ চারভাগে বিভক্ত, যথা—ঋক, সাম, যজুঃ ও অথর্ব। আবার প্রত্যেকটি বেদ সংহিতা, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক ও উপনিষদ—এই চারভাগে বিভক্ত। কোনো একজন সাহিত্যিক বেদ রচনা করেননি। ভিন্ন ভিন্ন সময়ে, ভিন্ন ভিন্ন ঋষি ও মহাপুরুষগণ বেদ রচনা করেছেন।
ঋগবেদ (ঋকবেদ) সেই সময়ের সর্বাপেক্ষা প্রাচীন ও সাহিত্যের মাঝে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত। প্রকৃতির অধিষ্ঠাতা দেবতাদের উদ্দেশ্যে এই বেদে ১০২৮টি ঋক বা স্তোত্রের বিবরণ রয়েছে। ঊষা, উন্দ্র, আকাশ, সূর্য, অগ্নি প্রমুখ দেবতার স্তুতি করা হয়েছে। অন্যদিকে সামবেদ— ঋগবেদ হতেই সংকলিত; তবে তাতে ছন্দ, মাত্রা, সুর ও সঙ্গীত সংমিশ্রিত হয়েছে। যজুর্বেদ গদ্য ও পদ্যের সংমিশ্রণ। এতে যাজ্ঞকর্মের পরিপূর্ণ বিবরণ ও বিভিন্ন মন্ত্র তুলে ধরা হয়েছে। বেদের শেষ স্তর হল—অথর্ব বেদ। উপরোক্ত তিন বেদে যে বিষয়গুলো স্থান পায়নি এই বেদে সেগুলো সংযুক্ত করা হয়েছে। এই বেদে অনেক উপদেবতার উপাসনার ইঙ্গিত, ঔষধপত্রের আলোচনা ও বশীকরণের বিভিন্ন মন্ত্র উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রাচীন বৈদিক যুগে বর্তমান সনাতন বা হিন্দু ধর্মের মত মূর্তিপূজা প্রচলিত ছিলনা। আর্যরা প্রকৃতির বিভিন্ন শক্তির প্রতি বিস্মিত হয়ে ভক্তি সহকারে দেব-দেবীরূপে তাদের উপাসনা করতে থাকে। জলের দেবতা বরুণ, বজ্রের দেবতা ইন্দ্র, ঝড়ের দেবতা মরুৎ, আলোর দেবতা সূর্যের উপাসনা—সমাজে ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। এছাড়া অগ্নি, বায়ু, উষা প্রমুখের উপাসনা করা হত। বিভিন্ন দেব-দেবীর উপাসনা করা সত্ত্বেও আর্যরা এটা ঠিকই উপলব্ধি করে যে, সমস্ত দেব-দেবী মূলত একই ঈশ্বরের বিভিন্ন রূপ। একেশ্বরবাদ সম্পর্কে বৈদিক সাহিত্যে অনেক স্তোত্র পাওয়া যায়। সেসময় আর্যরা দেবতাদের সন্তুষ্ট করার জন্য অগ্নিতে ঘৃতাহুতি দিত। এছাড়া বড় আকারে যজ্ঞের আয়োজন করা হত।
সুতরাং, আমরা বলতে পারি যে, বেদ কারো একক রচনা নয়। অনেক মুনী-ঋষীর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এটি রচিত হয়েছে। কালের আবর্তন ও প্রেক্ষাপট অনুযায়ী বেদে অনেক নতুন ও প্রয়োজনীয় অধ্যায় সংযোজনও করা হয়েছে। আর বেদ আগে থেকে রচনা করে আর্যরা ভারতে আসেনি। বরং, সমস্ত ঐতিহাসিকদের মত এটাই যে, আর্যদের আগমনের পর বেদ রচিত হয় এবং বৈদিক সভ্যতার সূচনা ঘটে। বেদের শ্লোকগুলোতেও আমরা কেবল ভারতবর্ষকেন্দ্রীক বিবরণ পাই। এতে ইউরোপ, এশিয়া মাইনর কিংবা ইরানের সমাজ, সভ্যতা, ধর্ম বা অর্থনীতির কোনো বিবরণ পাওয়া যায়না। বেদ ভারতে আসার পূর্বে রচিত হলে, তাতে অন্যান্য সময় ও দেশের বিস্তারিত বিবরণ উঠে আসত। কিন্তু অসংখ্য শ্লোক থেকে স্পষ্টতই বোঝা যায় যে, ভারতই বেদের কেন্দ্রভূমি ও উৎপত্তিস্থল।

