পূর্ব অস্ট্রেলিয়া এবং তাসমানিয়ার জলাশয়গুলোতে এমন এক প্রাণীর বসবাস, যা প্রথম দেখে বিজ্ঞানীরা ভেবেছিলেন এটি হয়তো কোনো সেলাই করা কৃত্রিম প্রাণী। হাঁসের মতো ঠোঁট, উটপাখির মতো লেজ আর জলহস্তীর মতো পায়ের গঠনযুক্ত এই প্রাণীটির নাম প্লাটিপাস (Ornithorhynchus anatinus)। এটি প্রাণীজগতের অন্যতম বড় বিস্ময়।
প্লাটিপাস মনোট্রিমাটা (Monotremata) বর্গের অন্তর্ভুক্ত। স্তন্যপায়ী হওয়া সত্ত্বেও এরা সরাসরি বাচ্চা প্রসব না করে চামড়ার মতো নরম ডিম পাড়ে। তবে এদের স্তন্যপায়ী বলা হয় কারণ মা প্লাটিপাস তার শরীর থেকে নিঃসৃত দুধের মাধ্যমে ছানাদের লালন-পালন করে।
জলের নিচে সিক্সথ সেন্স প্লাটিপাস মূলত নিশাচার বা গোধূলিলগ্নে সক্রিয় থাকে। মজার ব্যাপার হলো, জলের নিচে থাকাকালীন এরা চোখ, কান এবং নাক পুরোপুরি বন্ধ করে রাখে। শিকার ধরার জন্য এরা ব্যবহার করে এক অনন্য ইলেক্ট্রোমেকানিক্যাল সিস্টেম। এদের ঠোঁটে থাকা বিশেষ সেন্সর শিকারের (যেমন- জলজ পোকা বা ক্রাস্টেসিয়ান) পেশি থেকে নির্গত অতি সামান্য বৈদ্যুতিক তরঙ্গ শনাক্ত করতে পারে। ফলে অন্ধকার কাদার নিচেও এরা নিখুঁতভাবে পথ চলতে ও খাবার খুঁজতে পারে।
বিষাক্ত আত্মরক্ষণ দেখতে নিরীহ ও কিছুটা হাস্যকর মনে হলেও, পুরুষ প্লাটিপাসের গোড়ালিতে বিষাক্ত কাঁটা থাকে। এই বিষ ছোট কোনো প্রাণীকে মেরে ফেলতে পারে এবং মানুষের শরীরে তীব্র যন্ত্রণার সৃষ্টি করে। বিশেষ করে প্রজনন ঋতুতে পুরুষরা নিজেদের মধ্যে লড়াইয়ের সময় এই অস্ত্র ব্যবহার করে।
প্রাচীন ইতিহাস ও বিবর্তন ফসিল বা জীবাশ্ম রেকর্ড অনুযায়ী, প্রায় ১১ কোটি বছর আগেও পৃথিবীতে প্লাটিপাসের অস্তিত্ব ছিল। এদের নিকটতম আত্মীয় হলো ‘একইডনা’ (Echidna)। বিবর্তনের ধারায় এরা নিজেদের জলজ পরিবেশের সাথে এতটাই খাপ খাইয়ে নিয়েছে যে, কোটি বছর পার হলেও এরা আজও টিকে আছে এক অনন্য সত্তা নিয়ে।

