পাহাড়, নদী, ঝর্ণা আর হাওরের এক অপূর্ব মিতালী নেত্রকোনা। ভারতের মেঘালয় সীমান্তঘেঁষা উত্তরের এই জেলাটি যেন প্রকৃতির নিপুণ হাতে আঁকা এক ক্যানভাস। সুসং দুর্গাপুরের সাদা মাটির পাহাড় থেকে শুরু করে কলমাকান্দার পাহাড়ী ঝরনা আর খালিয়াজুরীর বিশাল জলরাশি—সব মিলিয়ে পর্যটনের এক বিশাল খনি হয়ে ওঠার কথা ছিল এই জনপদটি। কিন্তু প্রচারণার অভাব, জরাজীর্ণ যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং পর্যাপ্ত অবকাঠামোর সংকটে এই অপার সম্ভাবনা আজও পূর্ণতা পায়নি।
সারি সারি পাহাড় আর পাহাড়ের কোল ঘেঁষে বয়ে চলা স্বচ্ছ জলরাশি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপূর্ব নীলা ভূমি ভারতীয় সীমান্তবর্তী নেত্রকোনার দুর্গাপুর কলমাকান্দা উপজেলা। এখানে রয়েছে বাংলাদেশের একমাত্র চীনা মাটির পাহাড়। সাদা গোলাপি রঙ ধারণ করে থাকা পাহাড়, নীল জলের পুকুর প্রকৃতির নৈসর্গিক সৌন্দর্য অনুভব করতে দুর্গাপুর অতুলনীয়। দুর্গাপুরের মাটিতে পা রাখলেই সোমেশ্বরী নদীর সৌন্দর্য মন কেড়ে নেবে।
নেত্রকোনার পর্যটন মূলত তিনটি ভিন্ন রূপে বিভক্ত: পাহাড়ী সৌন্দর্য, হাওরের নীল জলরাশি এবং ঐতিহাসিক নিদর্শন।দুর্গাপুরের নীল জল ও সাদা মাটির পাহাড়: বিজয়পুরের চীনামাটির পাহাড় এবং এর পাদদেশে সোমেশ্বরী নদীর স্বচ্ছ নীল জল পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ। ২০২১ সালে দুর্গাপুরের এই সাদা মাটি ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ায় এর ব্র্যান্ডিং মূল্য আরও বেড়েছে।

বিরিশিরিতে অবস্থিত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী কালচারাল একাডেমি গারো ও হাজং সম্প্রদায়ের কৃষ্টি-সংস্কৃতি জানার এক অনন্য কেন্দ্র। বর্ষায় মোহনগঞ্জ ও খালিয়াজুরীর ডিঙ্গাপোতা হাওর হয়ে ওঠে এক মিনি কক্সবাজার। বিশেষ করে ‘মগড়া’ ও ‘ধনু’ নদীর সৌন্দর্য পর্যটকদের বিমোহিত করে। এছাড়াও এখানে রয়েছে বেশকিছু ঐতিহাসিক স্থাপনা। সুলতানি আমলের বোয়াইলবাড়ি দুর্গ, রোমান ক্যাথলিক চার্চ (রানীখং মিশন) এবং আধ্যাত্মিক সাধক শাহ সুলতান কমর উদ্দিন রুমী (র.)-এর মাজার জেলাটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন গন্তব্যের রূপ দিয়েছে।

সম্ভাবনা থাকলেও নেত্রকোনার পর্যটন খাত বেশ কিছু মৌলিক সমস্যায় জর্জরিত। নেত্রকোনা সদর থেকে দুর্গাপুর বা কলমাকান্দার সড়কগুলোর অবস্থা এখনো পুরোপুরি পর্যটনবান্ধব নয়। ধুলোবালি আর ভাঙাচোরা রাস্তার কারণে অনেক পর্যটকই এই এলাকায় আসতে নিরুৎসাহিত হন। দুর্গাপুর ও বিরিশিরিতে সরকারি কিছু গেস্ট হাউস থাকলেও সাধারণ পর্যটকদের জন্য উন্নত মানের বেসরকারি হোটেল বা রিসোর্টের অভাব প্রকট। এছাড়া পর্যটন স্পটগুলোর আশেপাশে মানসম্মত খাবারের হোটেল নেই বললেই চলে। সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় বিকেলের পর পর্যটকদের নিরাপত্তায় এক ধরনের অনিশ্চয়তা কাজ করে। যদিও ট্যুরিস্ট পুলিশের তৎপরতা শুরুর কথা শোনা যাচ্ছে, তবে তা এখনো দৃশ্যমান পর্যায়ে পৌঁছায়নি। পর্যটকদের ফেলে আসা প্লাস্টিক বর্জ্য এবং সোমেশ্বরী নদী থেকে অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনের ফলে প্রকৃতির আদি রূপ নষ্ট হচ্ছে।
স্থানীয় পর্যটন সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকার যদি দুর্গাপুর ও কলমাকান্দাকে একটি ‘বিশেষ পর্যটন জোন’ ঘোষণা করে অবকাঠামো উন্নয়ন করে, তবে এখান থেকে বছরে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব আয় সম্ভব। স্থানীয় ইজিবাইক চালক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অর্থনীতিও সরাসরি এই পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল।
স্থানীয় এক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা বলেন, “আমাদের এখানে পাহাড় আর নদী দেখতে মানুষ অনেক দূর থেকে আসে। কিন্তু থাকার জায়গা আর ভালো রাস্তা না থাকায় তারা একবার এসে দ্বিতীয়বার আর আসতে চায় না।”
নেত্রকোনার পর্যটনকে বিশ্বমানের করতে হলে আধুনিক রিসোর্ট স্থাপন, নিরবচ্ছিন্ন সড়ক যোগাযোগ এবং পর্যটন পুলিশের স্থায়ী ইউনিট অত্যন্ত জরুরি। প্রাকৃতিক এই সম্পদকে কাজে লাগিয়ে নেত্রকোনা হতে পারে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্র।

