Tuesday, April 7, 2026
34.2 C
Bangladesh

ভারতীয় দলের ক্রিকেটীয় সামর্থ ও শক্তির পুনর্মূল্যায়ন

কোনো সন্দেহ নেই যে, বর্তমান ক্রিকেটে ভারতের আধিপত্য অনেকটা নিরংকুশ। সেটা কেবল আইসিসিতে তাদের ব্যাপক ক্ষমতার জন্য নয়, বরং খেলার মাঠের অনবদ্য পারফর্ম্যান্সের জন্যও সত্য। ভারত একটা দীর্ঘ সময় ধরে বিশ্বক্রিকেটে নিজেদের সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে।

যদিও ২০২৪ সালে টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপের শিরোপা অর্জনই তাদের সাম্প্রতিক সময়ের সেরা অর্জন, যেখানে তারা ওয়ানডে বিশ্বকাপ জয়ের খুব কাছে অবস্থান করছিল। আহমেদাবাদে ২০২৩ সালের জমকালো ফাইনালে প্যাট কামিন্সের অস্ট্রেলিয়া স্বাগতিক ভারতকে বড় ব্যবধানেই পরাস্ত করে। নাহলে তারা আরেকটি শিরোপা নিজেদের করে নিতে পারতো।

ঐ বিশ্বকাপে তারা চোখ ধাঁধাঁনো পারফর্ম্যান্স করে। ব্যাটিংয়ে বিরাট কোহলি ধারাবাহিকভাবে রান করে গেছেন। বোলিংয়ে আগুন ঝরানো স্পেল দেখা গেছে বুমরাহ, কুলদ্বীপ ও সিরাজের হাত ধরে। এছাড়া ফিল্ডিং, ফিটনেস ও রানিং বিটউইন দা উইকেটে —ভারতের আত্মবিশ্বাস ও পরিশ্রমের প্রতিফলন দেখা গিয়েছে। এরকম সর্বগ্রাসী ও প্রায় অজেয় হয়ে ওঠা ভারতকে খেলার মাঠে পরাস্ত করা নানা কারণেই অসম্ভব হয়ে ওঠে প্রতিপক্ষের জন্য। যদিও টেম্বা বাভুমার দক্ষিণ আফ্রিকা তাদের সর্বশেষ সফরে টেস্ট সিরিজে ভারতকে ভালোভাবেই ধরাশায়ী করতে সমর্থ হয়।

এর আগে ওয়ানডে বিশ্বকাপের ফাইনালে প্যাট কামিন্সের সেই অবিস্মরণীয় জয়ের কথা তো এরই মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া একদম সাম্প্রতিক সময়ে দক্ষিণ আফ্রিকা কামিন্সের মত করে আহমেদাবাদেই টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপে স্বাগতিকদের বিরুদ্ধে ৭৬ রানের বড় জয় তুলে নিয়েছে। এরপর থেকে বেশ কিছু প্রশ্ন সামনে আসছে ভারতকে ঘিরে। ক্রীড়ামোদিরা জানতে আগ্রহ প্রকাশ করছেন যে, আসলেই কি তাদের ক্রিকেটীয় সামর্থ অজেয় — নাকি তাদেরও ভালো খেলে হারানো সম্ভব?

এই প্রশ্নের উত্তর আমরা খুঁজব কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টের আলোকে।

অভিষেক শর্মার উত্থান ও আকস্মিক ফর্মহীনতা : ক্যারিয়ারের শুরুতেই বিধ্বংসী ব্যাটিং দিয়ে ক্রিকেট দুনিয়াকে যথেষ্ট আলোড়িত করেছেন অভিষেক শর্মা্। বিশাল একেকটি ওভার বাউন্ডারিতে প্রতিপক্ষের বোলারদের জন্য মূর্তিমান আতঙ্ক —এই ভারতীয় ওপেনার! পাওয়ার প্লেতে তার আগ্রাসী উইলো যেভাবে প্রাধান্য বিস্তার করেছে গত প্রায় একটি বছর, তা ভারতের দর্শকদের মনে বিশেষ স্থান দখল করে থাকবে —তা বলাই যায়। টি টোয়েন্টিতে তিনিই এক বর্তমানে এক নম্বর ব্যাটসম্যান। ধারনা করা হচ্ছিল এই বিশ্বকাপেও তিনি আলো ছড়াবেন। কিন্তু আকস্মিভাবে পরপর তিন ম্যাচে তিনি শূন্য রানে প্যাভিলিয়নে ফেরেন। এরপর সুপার ওভারের প্রথম ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে রানের খাতা খুললেও সুবিধা করতে পারেননি খুব একটা। ১৫ রানের ছোট ইনিংস —দীর্ঘশ্বাসই উপহার দিয়েছে দর্শকদের। অনেকের মনেই শঙ্কার ছায়া রেখাপাত করেছে। অভিষেক কি তবে পাকিস্তানী পেস তারকা মোহাম্মদ আমিরের

মতানুসারে শুধুই ‘একজন স্লগার’? পরের ম্যাচেই জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ৩০ বলে ৫৫ রান করে সেটার জবাব দিয়েছেন ভারতীয় বাঁহাতি সেনসেশন। কিন্তু ক্রমেই অভিষেক যে, প্রতিপক্ষের কাছে এক্সপোজ হচ্ছেন —তা বলাই যায়। সব দলই তার ব্যাটিং কৌশল নিয়ে পরিকল্পনা করেই মাঠে নামছে। সুতরাং, আগামীতে তাকে তার ক্রিজে স্থায়ীত্ব বাড়াতে হবে। সব বলেই বাউন্ডারি ওভার বাউন্ডারির জন্য ব্যাট না চালিয়ে, খেলতে হবে সিঙ্গেলস এর জন্য। কিন্তু বিষয়টা সহজ হবেনা। কারণ অভিষেকও সম্ভবত তার অদম্য ও আগ্রাসী মনোভাব পরিবর্তন করতে চাইবেননা। এই কৌশলেই যেহেতু এতোদিন রান পেয়েছেন, সুতরাং সেই কৌশল তিনি পরিবর্তন না করতে পারেন। কিন্তু ক্রমাগত অফ ফর্মে থাকলে, তখন অভিষেক কী করবেন? সম্ভবত ভারতও তার ওপেনিং নির্ভরতা —অভিষেক শর্মার ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুটা চিন্তিত।

স্পিনে মিডল অর্ডারের দুর্বলতা : চলমান টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপের পাঁচটি ম্যাচ পেরিয়ে আসার পর ভারতের টপ-অর্ডারকে এখন তাদের অতীতের ছায়া মনে হচ্ছে অনেকের। এমনকি জয়ের ম্যাচগুলোতেও অভ্যন্তরীন সংশয় আর ভুল সিদ্ধান্ত তাদের পিছু ছাড়েনি। স্পিন বোলিংয়ের বিরুদ্ধে ব্যাটিংই তাদের সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে—এই ধরনের বোলিংয়ের বিপক্ষে তাদের ভাগ্য পরিবর্তন রীতিমতো হাস্যকর পর্যায়ে পৌঁছেছে। এই টুর্নামেন্টের আগের দুই বছরে পূর্ণ সদস্য দেশগুলোর মধ্যে স্পিনের বিরুদ্ধে ভারতের গড় ছিল ঈর্ষণীয় ৩৯.১১ এবং স্ট্রাইক রেট ১৫৯.৮৯। অথচ বিশ্বকাপে তারা একেবারে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে, গড় নেমেছে ১৭.৫২-এ এবং স্ট্রাইক রেট ১২০.৬৫—যা আইসিসির পূর্ণ মেম্বার এমন দেশগুলোর মধ্যে এটা দ্বিতীয় সর্বনিম্ন।

তিলক ভার্মা এবং অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদবের বেশ সাফার করছেন। এই টুর্নামেন্টে ভারতের হয়ে স্পিনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি ভুগেছেন তিন ও চার নম্বরে নামা এই দুই ব্যাটার। তাদের রান না পাওয়াটা ভারতের এমনিতেই নড়বড়ে টপ অর্ডারের বিপদ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।স্পিনের বিরুদ্ধে দলনায়ক সূর্যকুমার ৭৪ বলে মাত্র ৭৯ রান করেছেন (স্ট্রাইক রেট: ১০৬.৭৫) এবং তিলকের অবস্থা আরও খারাপ, ৪৮ বলে ৪৫ রান (স্ট্রাইক রেট: ৯৩.৭৫)।  নতুন এই সমস্যার দিকে ভারতকে মনোনিবেশ করতেই হবে। যদিও তাদের ব্যাটিং ডেপথ অনেক। এমনকি টেল এন্ডাররাও যথেষ্ট ভালো।

বোলার ও একাদশ নির্বাচনে সমস্যা: জসপ্রীত বুমরাহ আগের মত আগুন ছড়ানো বোলিং করতে পারছেননা। তারপরও ভারতীয় বোলিং আক্রমণের নেতা তিনিই। এই বিশ্বকাপেও দারুন পারফর্ম করছেন এই পেসার। অর্শদ্বীপ আরেক প্রান্ত থেকে তাকে যথেষ্ট সহায়তা করছেন। কিন্তু ব্যাটিং ডেপথ বাড়াতে ও অলরাউন্ডার সংখ্যা বাড়াতে স্কোয়াডে নিয়মিত খেলছেন শিবম দুবে। বল হাতে তিনি অতোটা কার্যকর নন। প্রায়ই প্রতিপক্ষের ব্যাটসম্যানরা দুবের ওভারগুলোতে অনেক রান তুলে ফেলছেন। সে জায়গায় কুলদ্বীপ খেললে তা বেশি ইতিবাচক হত। কিন্তু মিস্ট্রি স্পিনার বরুণ চক্রবর্তী থাকায় কুলদ্বীপকে ছাড়াই একাদশ নির্বাচন করছে ম্যানেজমেন্ট। এদিকে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে অক্ষর প্যাটেলের জায়গায়  ওয়াশিংটন সুন্দরকে খেলিয়ে ব্যাপক সমালোচনার শিকার হন নির্বাচকরা। সব মিলিয়ে কুলদ্বীপ, ওয়াশিংটন ও অক্ষরকে নিয়ে এক ধরনের সিদ্ধান্তহীনতা মোটামোটি স্পষ্ট। প্রতিপক্ষ বুঝে স্কোয়াড সাজানোই আপাতত ম্যানেজমেন্টের কৌশল বলে মনে হচ্ছে।

ভালো প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে এলোমেলো হয়ে যাওয়া : ভারত এশিয়ার দলগুলোর পাশাপাশি জিম্বাবুয়ে, ওয়েস্ট ইন্ডিজ বা নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে মোটা দাগে সফল হলেও ব্যতিক্রম ঘটছে সত্যিকারের বড় দলগুলোর বিপক্ষে। অস্ট্রেলিয়া তো আছেই, বর্তমানে দক্ষিণ আফ্রিকা এবং ইংল্যান্ডও তাদের জন্য চিন্তার কারণ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে যেসব দল ভালো কৌশল ও পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নামছে এবং মাঠে তার যথাযথ বাস্তবায়ন করতে পারে তাদের বিরুদ্ধে তাদের অসহায়ত্ব এখন প্রকাশ্য। সুতরাং ভারসাম্যপূর্ণ এবং সত্যিকার অর্থে অজেয় দল হতে হলে ভারতকে এসব বিষয় নিয়ে ভালোভাবে কাজ করতে হবে।    

জনপ্রিয়

More like this
Related

শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী (রহঃ) : জীবন ও তৎপরতার সংক্ষিপ্ত রূপ

আরেফিন আল ইমরান সংক্ষিপ্ত আলোচনার মাধ্যমে একজন মহত্তম ব্যক্তিকে তুলে...

বাজার অস্থিরতা: কম্পিউটার এক্সেসরিজের হঠাৎ করে লাগামহীন দাম কেন? কবে ফিরবে স্বাভাবিক দামে ?

দেশের বাজারে কম্পিউটার এক্সেসরিজ বা ইলেকট্রিক পণ্যের বাজার হঠাৎ...

বিশ্বজুড়ে চিনির বিকল্প হিসেবে জনপ্রিয় হচ্ছে,ওষুধি গাছ ‘স্টেভিয়া’

অ্যাস্টার পরিবারের (Asteraceae) ফুলের উদ্ভিদ যা হচ্ছে স্টেভিয়া, (Stevia...