Friday, May 8, 2026
35.1 C
Bangladesh

জিহাদ সম্পর্কে ইসলাম

বর্তমান বৈশ্বিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘জিহাদ’ শব্দটি ব্যাপক আলোচনার বিষয়বস্তু। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এই পবিত্র ও মহান ধারণাটি বর্তমানে সবচাইতে বেশি ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। একদিকে ইসলাম বিদ্বেষী গোষ্ঠীর প্রোপাগান্ডা, অন্যদিকে কিছু পথভ্রষ্ট চরমপন্থী গোষ্ঠীর অপব্যাখ্যা—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পড়ে জিহাদের প্রকৃত অর্থ সাধারণ মানুষের কাছে প্রায় অচেনা হয়ে পড়েছে। আজকের নিবন্ধে আমরা জিহাদের প্রকৃত সংজ্ঞা, ইসলামের যুদ্ধনীতি এবং ইতিহাসের পাতায় সবচাইতে বড় রক্তপাতগুলোর নেপথ্যে থাকা শক্তি গুলোকে নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

‘জিহাদ’ (Jihad) একটি আরবি শব্দ, যার মূল ধাতুমূল হলো ‘জুহদ’। এর শাব্দিক অর্থ হলো কোনো মহৎ লক্ষ্য অর্জনের জন্য কঠোর প্রচেষ্টা বা সংগ্রাম করা। ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় জিহাদ মানে কেবল তলোয়ার চালানো নয়। ইসলামের মহানবী (সা.) জিহাদকে তিনটি প্রধান স্তরে বিন্যস্ত করেছেন:
এটি হলো নিজের অন্তরের কুপ্রবৃত্তি, লোভ, লালসা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই। ইসলাম একে ‘জিহাদে আকবর’ বা সবচাইতে বড় জিহাদ হিসেবে ঘোষণা করেছে। একজন মানুষ যদি নিজের রিপুকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, তবে সে প্রকৃত মুমিন হতে পারে না।

সমাজে বিরাজমান কুসংস্কার, অন্ধকার এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে কলম, যুক্তি এবং শিক্ষার মাধ্যমে প্রচার চালানোই হলো জিহাদ বিল-ইলম। বর্তমান যুগে ইসলামের যৌক্তিক সৌন্দর্য তুলে ধরাও এই জিহাদের অন্তর্ভুক্ত।

এটি জিহাদের সর্বশেষ পর্যায়। যখন মুসলিম জাতি বা ভূখণ্ড আক্রান্ত হয়, তখন আত্মরক্ষার্থে এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য অস্ত্র ধারণ করাকে এই জিহাদ বলা হয়। এটি কোনো আগ্রাসন বা নিরপরাধ মানুষকে হত্যার নাম নয়, বরং এটি আত্মরক্ষার বৈধ অধিকার।

পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো ধর্ম বা দর্শন যুদ্ধের ময়দানেও এত কঠোর মানবিক নিয়ম দেয়নি, যা ইসলাম দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) এবং পরবর্তী খলিফাদের যুগে যুদ্ধের জন্য কিছু অপরিবর্তনীয় নিয়ম ছিল:
কোনো নারী, শিশু বা বৃদ্ধকে হত্যা করা যাবে না।
অমুসলিমদের উপাসনালয় (গির্জা, মন্দির, প্যাগোডা) ধ্বংস করা যাবে না।
গাছপালা কাটা বা গবাদি পশু হত্যা করা যাবে না।
কৃষক বা অমুসলিম ধর্মযাজকদের ওপর হামলা করা যাবে না।
যুদ্ধবন্দীদের সাথে সদয় আচরণ করতে হবে।

পবিত্র কুরআনের সূরা মায়িদার ৩২ নম্বর আয়াতে স্পষ্ট বলা হয়েছে— “যে ব্যক্তি কোনো মানুষকে (অন্যায়ের প্রতিশোধ ছাড়া) হত্যা করল, সে যেন পুরো মানবজাতিকেই হত্যা করল।” এই আয়াতটিই প্রমাণ করে ইসলামে মানুষের প্রাণের মূল্য কত বেশি।

পশ্চিমা গণমাধ্যমে প্রায়ই ইসলামকে একটি সহিংস ধর্ম হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বড় হত্যাযজ্ঞের সাথে ইসলামের দূরতম কোনো সম্পর্ক নেই।

বিংশ শতাব্দীতে সংঘটিত প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ছিল মানুষের তৈরি সবচাইতে বড় নরক কুণ্ড।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ: প্রায় ২ কোটি মানুষ নিহত হয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ: প্রায় ৭ কোটি থেকে ৮ কোটি মানুষ নিহত হয়। এই দুই যুদ্ধের নেপথ্যে ছিল ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদ, জাতীয়তাবাদ এবং রাজনৈতিক আধিপত্যের লড়াই। এই বিশাল হত্যাযজ্ঞের জন্য কোনো মুসলিম বা কোনো ধর্ম দায়ী ছিল না, ছিল মানুষের সীমাহীন লোভ।

খ. নাৎসি বাহিনীর হলোকাস্ট
অ্যাডলফ হিটলারের নেতৃত্বে নাৎসি জার্মানি প্রায় ৬০ লক্ষ ইহুদিকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল। এটি ছিল বিংশ শতাব্দীর সবচাইতে বড় ট্র্যাজেডিগুলোর একটি, যার মূলে ছিল চরম বর্ণবাদ এবং উগ্র জাতীয়তাবাদ।
গ. হিরোশিমা ও নাগাসাকি
মানব ইতিহাসের একমাত্র পারমাণবিক হামলা চালানো হয়েছিল জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে। মুহূর্তের মধ্যে লক্ষ লক্ষ বেসামরিক মানুষ পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল। এই অপরাধটি কোনো ‘জিহাদী’ গোষ্ঠী করেনি, বরং করেছে একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র।

ইতিহাসবিদদের মতে, ধর্মের দোহাই দিয়ে যুদ্ধ হলেও অধিকাংশ যুদ্ধের মূল কারণ ছিল ভূমি দখল এবং সম্পদ আহরণ।

ঐতিহাসিক ঘটনা নিহতের সংখ্যা (আনুমানিক)মূল কারণ
ইউরোপীয়দের আমেরিকা বিজয় ১০০ মিলিয়ন (আদিবাসী)ঔপনিবেশিক দখলদারিত্ব
ক্রুসেড (ধর্মযুদ্ধ)১.৭ মিলিয়নধর্মীয় ও রাজনৈতিক আধিপত্য
মঙ্গোল আক্রমণ ৪০ মিলিয়ন সাম্রাজ্য বিস্তার
ভিয়েতনাম যুদ্ধ ৩.৮ মিলিয়নসাম্যবাদ বনাম পুঁজিবাদের লড়াই

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ৫০০ বছরে তথাকথিত সেক্যুলার আদর্শ, রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং সাম্রাজ্যবাদের কারণে যত মানুষ নিহত হয়েছে, তার তুলনায় ধর্মের নামে সংঘটিত প্রাণহানি মাত্র ৫ শতাংশের নিচে।

বর্তমানে পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলোতে ‘ইসলামিক টেররিজম’ বা ‘ইসলামি সন্ত্রাসবাদ’ শব্দ বন্ধটি বারবার ব্যবহার করা হয়। অথচ যারা এই সন্ত্রাসবাদ চালায়, তারা ইসলামের মূল নীতি থেকে বিচ্যুত।

কেন এই অপপ্রচার?
১. রাজনৈতিক স্বার্থ: মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও খনিজ সম্পদ দখলের জন্য মুসলিম দেশগুলোতে অস্থিরতা জিইয়ে রাখা হয়।
২. অস্ত্র ব্যবসা: যুদ্ধ চললে বড় দেশগুলোর অস্ত্রের বাজার চাঙ্গা থাকে।
৩. ভুল সংজ্ঞা: অনেক সময় রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে ‘সন্ত্রাসবাদ’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়।

জিহাদ মানে ঘৃণা নয়, জিহাদ মানে ভালোবাসা ও ন্যায়বিচার। ইসলাম মানেই শান্তি। যারা নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করে জান্নাতের স্বপ্ন দেখে, তারা মূলত পথভ্রষ্ট। অন্যদিকে, যারা ইসলামকে সহিংসতার ধর্ম হিসেবে প্রচার করে, তারা ইতিহাসের সত্যকে অস্বীকার করছে।

ইতিহাসের মহাযুদ্ধ থেকে শুরু করে আধুনিক সময়ের গৃহযুদ্ধ—সবখানেই দেখা গেছে যে মানুষের লোভই হলো মূল শত্রু। দাঙ্গা ও ফ্যাসাদ কোনো ধর্মের শিক্ষা নয়, বরং ধর্মহীনতারই ফলাফল। আজ সময় এসেছে জিহাদের প্রকৃত সংজ্ঞাকে ধারণ করে একটি ইনসাফভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলার, যেখানে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সবাই নির্বিঘ্নে তাদের ধর্ম পালন করতে পারবে।

শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানই হোক আমাদের ভবিষ্যৎ।

জনপ্রিয়

More like this
Related

শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী (রহঃ) : জীবন ও তৎপরতার সংক্ষিপ্ত রূপ

আরেফিন আল ইমরান সংক্ষিপ্ত আলোচনার মাধ্যমে একজন মহত্তম ব্যক্তিকে তুলে...

বাজার অস্থিরতা: কম্পিউটার এক্সেসরিজের হঠাৎ করে লাগামহীন দাম কেন? কবে ফিরবে স্বাভাবিক দামে ?

দেশের বাজারে কম্পিউটার এক্সেসরিজ বা ইলেকট্রিক পণ্যের বাজার হঠাৎ...

বিশ্বজুড়ে চিনির বিকল্প হিসেবে জনপ্রিয় হচ্ছে,ওষুধি গাছ ‘স্টেভিয়া’

অ্যাস্টার পরিবারের (Asteraceae) ফুলের উদ্ভিদ যা হচ্ছে স্টেভিয়া, (Stevia...