বাংলাদেশের মানচিত্রের শিরা-উপশিরা হয়ে বয়ে চলা নদ-নদীগুলো আজ অস্তিত্ব সংকটে। এক সময়ের প্রমত্তা নদীগুলো এখন শিল্পবর্জ্য, প্লাস্টিক দূষণ আর দখলের কবলে পড়ে মৃতপ্রায়। পরিবেশবিদদের মতে, দেশের প্রায় অধিকাংশ নদ-নদী এখন তীব্র দূষণের শিকার, যা কেবল জলজ প্রাণবৈচিত্র্য নয়, বরং জনস্বাস্থ্য ও জাতীয় অর্থনীতির জন্যও চরম হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরেজমিনে ঢাকার চারপাশের নদীগুলো— বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা— পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, এগুলোর পানি এখন আলকাতরার মতো কালো ও দুর্গন্ধযুক্ত। নদী তীরের ডাইং কারখানা, ট্যানারি এবং রাসায়নিক কলকারখানা থেকে নির্গত অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি মিশছে পানিতে। একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক ও পলিথিন নদীর তলদেশে কয়েক স্তরের আস্তর তৈরি করেছে, যা পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করছে। ঢাকা ও বড় শহরগুলোর ড্রেনেজ লাইনের বর্জ্য কোনো প্রকার ফিল্টারিং ছাড়াই নদীতে পড়ছে।
নদী দূষণের ফলে দেশের পরিবেশগত ভারসাম্য চরমভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। জলজ প্রাণের বিলুপ্তি: পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের (Dissolved Oxygen) মাত্রা বিপজ্জনক পর্যায়ে নেমে এসেছে। বুড়িগঙ্গার অনেক স্থানে অক্সিজেনের মাত্রা প্রায় শূন্য, যেখানে মাছ বা অন্য কোনো জলজ প্রাণীর বেঁচে থাকা অসম্ভব। নদীর বিষাক্ত পানি দিয়ে সেচ কাজ চালানোয় ধান ও সবজির মাধ্যমে ভারী ধাতু (যেমন: ক্যাডমিয়াম, সীসা) মানুষের খাদ্যতালিকায় ঢুকে পড়ছে। নদীর উপরিভাগের পানি দূষিত হওয়ায় ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ বাড়ছে, ফলে পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে।
পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, নদী রক্ষা করতে না পারলে আগামী কয়েক দশকে বাংলাদেশ এক ভয়াবহ মরুপ্রক্রিয়ার সম্মুখীন হতে পারে।
নদী বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. সামসুল আলম বলেন, “নদী কেবল পানি নয়, এটি একটি জীবন্ত সত্তা। আমরা যদি এখনই শিল্পের ইটিপি (Effluent Treatment Plant) নিশ্চিত করতে না পারি এবং দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেই, তবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এক বিষাক্ত বদ্বীপ পাবে।”
সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এই সংকট মোকাবিলায় বেশ কিছু জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে। নদী দখল ও দূষণকারীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: প্রতিটি কলকারখানায় ইটিপি ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা এবং কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার নির্মাণ। গণসচেতনতা: সাধারণ মানুষকে নদী রক্ষায় উদ্বুদ্ধ করা এবং পলিথিন ব্যবহার বন্ধ করা। নদী বাঁচলে বাঁচবে দেশ। বাংলাদেশের প্রকৃতি ও অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে নদী দূষণ রোধ এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

