Wednesday, July 29, 2026
30.2 C
Bangladesh

নিঃশ্বাসের লড়াই যখন ঘুমের শত্রু: ব্রেথিং-রিলেটেড স্লিপ ডিসঅর্ডার ও আমাদের করণীয়

সারাদিন কাজের চাপে ক্লান্ত হয়ে রাতে যখন আমরা বিছানায় যাই, তখন আমাদের একমাত্র চাওয়া থাকে একটু শান্তির ঘুম। কিন্তু ভাবুন তো, আপনার সেই শান্তির ঘুমই যদি আপনার জীবনের জন্য ঝুঁকি হয়ে দাঁড়ায়? চিকিৎসা বিজ্ঞানে একে বলা হয় ‘ব্রেথিং-রিলেটেড স্লিপ ডিসঅর্ডার’ বা শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত ঘুমের ব্যাধি। বর্তমানে জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং স্থূলতার কারণে বিশ্বজুড়ে এই সমস্যাটি মহামারি আকার ধারণ করছে।

সহজ কথায়, ঘুমের মধ্যে স্বাভাবিক শ্বাস-প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটাই হলো এই ডিসঅর্ডার। যারা এই সমস্যায় ভোগেন, তাদের ঘুমের মধ্যে বারবার শ্বাস থমকে যায় অথবা শ্বাস অত্যন্ত অগভীর হয়ে পড়ে। এর ফলে শরীরের অক্সিজেনের মাত্রা কমে যায় এবং মস্তিষ্ক বাধ্য হয়ে ব্যক্তিকে জাগিয়ে তোলে যাতে সে পুনরায় শ্বাস নিতে পারে। যদিও এই জেগে ওঠাটা মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য হয় এবং ব্যক্তি নিজেও তা বুঝতে পারেন না, কিন্তু এটি গভীর ঘুমের চক্রকে পুরোপুরি নষ্ট করে দেয়।

মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে (DSM-IV-TR নির্দেশিকা অনুযায়ী), একে মূলত তিন ভাগে ভাগ করা যায়:
১. অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া (OSA): এটি সবচেয়ে সাধারণ। গলার মাংসপেশি শিথিল হয়ে বায়ুপথ বন্ধ করে দিলে এমনটি হয়।
২. সেন্ট্রাল স্লিপ অ্যাপনিয়া: এখানে বায়ুপথ খোলা থাকলেও মস্তিষ্ক শ্বাস নেওয়ার সংকেত পাঠাতে ভুলে যায়।
৩. সেন্ট্রাল অ্যালভিওলার হাইপোভেন্টিলেশন: যেখানে শ্বাস এতই অগভীর হয় যে রক্তে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন পৌঁছাতে পারে না।

এই রোগের সবচেয়ে বড় লক্ষণ হলো দিনের বেলা প্রচণ্ড ঘুম পাওয়া। রাতে দীর্ঘক্ষণ ঘুমানোর পরেও সকালে নিজেকে ক্লান্ত মনে হওয়া বা কাজ করতে করতে হঠাৎ ঘুমিয়ে পড়া এই রোগের প্রধান সংকেত। গবেষণায় দেখা গেছে, আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ দিনের বেলা অতিরিক্ত ঘুম অনুভব করেন এবং বাকি এক-তৃতীয়াংশ অনিদ্রা বা ইনসোমনিয়ায় ভোগেন।

অন্যান্য লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে:
★ঘুমের মধ্যে উচ্চশব্দে নাক ডাকা (বিশেষ করে অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়ার ক্ষেত্রে)।

★হঠাৎ শ্বাস বন্ধ হয়ে ধড়ফড় করে জেগে ওঠা।

★সকালে মাথাব্যথা এবং মুখ শুকিয়ে থাকা।

★মনোযোগের অভাব এবং মেজাজ খিটখিটে হওয়া।

পরিসংখ্যান বলছে, মধ্যবয়সী পুরুষদের মধ্যে ৪ শতাংশ এবং নারীদের মধ্যে ২ শতাংশ এই সমস্যায় আক্রান্ত। তবে শিশুদের ক্ষেত্রেও এটি সমানভাবে দেখা দিতে পারে, বিশেষ করে যাদের টনসিল বা অ্যাডেনয়েড বড়। স্থূলতা এই রোগের অন্যতম প্রধান কারণ। ওজন বাড়ার সাথে সাথে গলার চারপাশের চর্বি বায়ুপথে চাপ সৃষ্টি করে, যা শ্বাস নেওয়া কঠিন করে তোলে। এছাড়া বয়স্ক ব্যক্তিদের মধ্যে ‘সেন্ট্রাল স্লিপ অ্যাপনিয়া’ বেশি দেখা যায়, যা অনেক সময় হৃদরোগ বা স্নায়বিক সমস্যার সাথে যুক্ত থাকে।

অনেকেই সাধারণ নাক ডাকা ভেবে এই সমস্যাকে অবহেলা করেন। কিন্তু চিকিৎসকরা বলছেন, এটি পরীক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। সাধারণত একজন নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞ (ENT) বা ঘুম বিশেষজ্ঞ রোগীর শারীরিক পরীক্ষা করেন। এরপর ‘পলিসমনোগ্রাম’ (Polysomnogram) নামক একটি পরীক্ষার মাধ্যমে রোগীর ঘুমের প্যাটার্ন, হৃদস্পন্দন, অক্সিজেনের মাত্রা এবং মস্তিষ্কের তরঙ্গ পর্যবেক্ষণ করা হয়। এটিই নিশ্চিত করে রোগী আসলে কোন ধরনের স্লিপ ডিসঅর্ডারে ভুগছেন।

যারা অতিরিক্ত ওজনের কারণে এই সমস্যায় ভুগছেন, তাদের জন্য ওজন কমানো হলো মুখ্য বিষয় । সুষম খাবার এবং নিয়মিত ব্যায়ামের মাধ্যমে ওজন কমাতে পারলে অনেক ক্ষেত্রে রোগটি নিজে থেকেই সেরে যায়।

সি-প্যাপ (CPAP) থেরাপি এটি অত্যন্ত কার্যকর একটি পদ্ধতি। একটি যন্ত্রের মাধ্যমে ঘুমের সময় মাস্কের সাহায্যে নাকে বায়ুর চাপ দেওয়া হয়, যা বায়ুপথকে খোলা রাখে। যদিও শুরুতে এটি কিছুটা অস্বস্তিকর মনে হতে পারে, কিন্তু বর্তমানে ‘বি-প্যাপ’ বা ‘সি-ফ্লেক্স’-এর মতো উন্নত প্রযুক্তি আসায় এটি এখন অনেক বেশি আরামদায়ক।

যদি কোনো শারীরিক কাঠামোগত ত্রুটির কারণে শ্বাসকষ্ট হয়, তবে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে গলার অতিরিক্ত টিস্যু বা টনসিল অপসারণ করা যেতে পারে। এছাড়া ‘ম্যান্ডিবুলার অ্যাডভান্সমেন্ট ডিভাইস’ নামক এক ধরনের মাউথপিসও বেশ কার্যকর, যা নিচের চোয়ালকে সামনে এগিয়ে রেখে বায়ুপথ উন্মুক্ত রাখে।

চিকিৎসকরা পরামর্শ দেন যে, স্লিপ অ্যাপনিয়ার রোগীদের অ্যালকোহল এবং ঘুমের ওষুধ থেকে দূরে থাকা উচিত। কারণ এগুলো গলার মাংসপেশিকে আরও বেশি শিথিল করে দেয়, যা শ্বাসরোধের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে। এছাড়াও চিৎ হয়ে শোয়ার বদলে পাশ ফিরে শোয়া বা বালিশের সঠিক ব্যবহার (পজিশনাল থেরাপি) উপকারে আসতে পারে।

ব্রেথিং-রিলেটেড স্লিপ ডিসঅর্ডার কেবল একটি ঘুমের সমস্যা নয়, এটি দীর্ঘমেয়াদী বিষণ্ণতা, উচ্চ রক্তচাপ এবং হৃদরোগের কারণ হতে পারে। তাই যদি আপনার পরিচিত কেউ ঘুমের মধ্যে অতিরিক্ত নাক ডাকেন বা দিনের বেলা অস্বাভাবিক ক্লান্ত থাকেন, তবে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে উৎসাহিত করুন। সচেতনতাই পারে আপনার রাতের ঘুমকে শান্তিময় এবং জীবনকে নিরাপদ করতে।

জনপ্রিয়

More like this
Related

শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী (রহঃ) : জীবন ও তৎপরতার সংক্ষিপ্ত রূপ

আরেফিন আল ইমরান সংক্ষিপ্ত আলোচনার মাধ্যমে একজন মহত্তম ব্যক্তিকে তুলে...

বাজার অস্থিরতা: কম্পিউটার এক্সেসরিজের হঠাৎ করে লাগামহীন দাম কেন? কবে ফিরবে স্বাভাবিক দামে ?

দেশের বাজারে কম্পিউটার এক্সেসরিজ বা ইলেকট্রিক পণ্যের বাজার হঠাৎ...

বিশ্বজুড়ে চিনির বিকল্প হিসেবে জনপ্রিয় হচ্ছে,ওষুধি গাছ ‘স্টেভিয়া’

অ্যাস্টার পরিবারের (Asteraceae) ফুলের উদ্ভিদ যা হচ্ছে স্টেভিয়া, (Stevia...