এক জীবন্ত জীবাশ্মের গল্প
এমন এক প্রাণীর কথা ভাবুন যা ডাইনোসরদের আবির্ভাবের কোটি বছর আগে থেকে পৃথিবীতে আছে এবং পাঁচটি মহাপ্রলয় থেকে বেঁচে ফিরেছে। এটি হলো ঘোড়ার নাল কাঁকড়া (Limulus polyphemus)। এদের দেখতে অদ্ভুত লাগলেও এরা আসলে কাঁকড়া নয়, বরং মাকড়সা এবং বিচ্ছুর আত্মীয়। গত ৪৪০ মিলিয়ন বছর ধরে এরা প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে। বর্তমানে এই প্রাণীটি চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং পরিবেশের জন্য এক অপরিহার্য নাম।
ডেলাওয়্যার বে-র মহাজাগতিক মেলা
প্রতি বছর মে এবং জুন মাসের পূর্ণিমা ও অমাবস্যার জোয়ারে আমেরিকার ডেলাওয়্যার বে এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের সাক্ষী হয়। হাজার হাজার ঘোড়ার নাল কাঁকড়া সমুদ্র থেকে তীরে উঠে আসে ডিম পাড়ার জন্য। স্ত্রী কাঁকড়াগুলো বালির নিচে গর্ত করে হাজার হাজার ডিম পাড়ে, আর পুরুষ কাঁকড়াগুলো সেই ডিম নিষিক্ত করে। এই দৃশ্যটি কেবল একটি প্রজনন প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি একটি বিশাল বাস্তুতন্ত্রের বেঁচে থাকার রসদ।
এক বিপন্ন বন্ধু
আমেরিকান রেড নট নামের এক বিশেষ প্রজাতির পরিযায়ী পাখি এই কাঁকড়ার ডিমের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। এই পাখিরা দক্ষিণ আমেরিকা থেকে আর্কটিক পর্যন্ত দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার সময় ডেলাওয়্যার বে-তে যাত্রাবিরতি দেয়। ক্ষুধার্ত পাখিরা এই পুষ্টিকর ডিম খেয়ে তাদের পরবর্তী যাত্রার শক্তি সঞ্চয় করে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো, ২০০২ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে কাঁকড়ার সংখ্যা প্রায় ৯০ শতাংশ কমে যাওয়ায় এই পাখিদের সংখ্যাও আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। প্রকৃতির এই শৃঙ্খলা ভেঙে পড়লে পুরো উপকূলীয় পরিবেশ হুমকির মুখে পড়বে।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের আশীর্বাদ
ঘোড়ার নাল কাঁকড়ার সবচেয়ে বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য হলো এর নীল রক্ত। এদের রক্তে ‘কোয়াগুলোজেন’ (Coagulogen) নামক একটি প্রোটিন থাকে যা অত্যন্ত সংবেদনশীল। এটি এক ট্রিলিয়ন ভাগের এক ভাগ ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি শনাক্ত করতে পারে এবং সেটিকে একটি জেলের মতো আবরণে আটকে ফেলে।
১৯৫৬ সালে বিজ্ঞানীরা এই বিশেষ বৈশিষ্ট্য আবিষ্কার করেন, যা থেকে এলএএল (LAL) টেস্ট পদ্ধতি উদ্ভাবিত হয়। বর্তমানে দুনিয়ার সমস্ত ইনজেকশন, ভ্যাকসিন এবং মেডিকেল সরঞ্জাম এই পরীক্ষার মাধ্যমে নিরাপদ করা হয়। অর্থাৎ, আপনার শরীরে প্রবেশ করানো যেকোনো ওষুধ যে জীবাণুমুক্ত, তা নিশ্চিত করে এই কাঁকড়ার রক্ত। এই রক্তের প্রতি গ্যালনের মূল্য হাজার হাজার ডলার।
টোপ, রক্ত এবং আবাসন
এত উপকার করা সত্ত্বেও মানুষই এই প্রাণীর প্রধান শত্রু। বাণিজ্যিক জেলেরা মাছ ধরার টোপ হিসেবে এই কাঁকড়া ব্যবহার করে। যদিও এখন কিছু নিয়ম করা হয়েছে, তবুও জালে আটকা পড়ে অনেক কাঁকড়া মারা যায়।
চিকিৎসা শিল্পের জন্য প্রতি বছর কয়েক লাখ কাঁকড়া ধরা হয়। রক্ত নেওয়ার পর তাদের আবার সমুদ্রে ছেড়ে দেওয়া হলেও, গবেষণায় দেখা গেছে প্রায় ৩০ শতাংশ কাঁকড়া এই ধকল সইতে না পেরে মারা যায়। এর ওপর সমুদ্র সৈকতে ঘরবাড়ি এবং হোটেল নির্মাণের ফলে এদের প্রজনন ক্ষেত্র দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে।
আমাদের করণীয়
ঘোড়ার নাল কাঁকড়া কেবল একটি সামুদ্রিক প্রাণী নয়, এটি আমাদের জীবন রক্ষার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। বর্তমানে নিউ ইংল্যান্ডের মতো কিছু জায়গায় এদের সংখ্যা কমলেও, যথাযথ সংরক্ষণের ফলে অনেক জায়গায় এদের সংখ্যা আবার স্থিতিশীল হতে শুরু করেছে। আমাদের উচিত সমুদ্র সৈকত রক্ষা করা এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানে কৃত্রিম বিকল্প ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া। এই প্রাচীন রক্ষককে বাঁচিয়ে রাখা মানেই আমাদের নিজেদের ভবিষ্যৎ নিরাপদ রাখা।

