Wednesday, July 29, 2026
32.2 C
Bangladesh

কেন অ্যান্টিবায়োটিক ভাইরাসের বিরুদ্ধে কাজ করে না?

জীববিজ্ঞানের এক রহস্যময় সত্তা হলো ভাইরাস। এদের জীবন ও জড়ের মধ্যবর্তী এক অস্তিত্ব হিসেবে বর্ণনা করা হয়। সাধারণ সর্দি-কাশি থেকে শুরু করে বিশ্বব্যাপী মহামারি সৃষ্টিতে এই অতি ক্ষুদ্র সংক্রামক জীবাণুগুলোর ভূমিকা অপরিসীম।

ভাইরাস হলো জৈবিক গঠনশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন। ব্যাকটেরিয়া যেখানে একটি পূর্ণাঙ্গ কোষীয় জীব, সেখানে ভাইরাস কেবল প্রোটিন আবরণী দ্বারা বেষ্টিত কিছু জেনেটিক উপাদানের (DNA বা RNA) সমষ্টি। এই প্রোটিন আবরণকে বলা হয় ক্যাপসিড। ভাইরাসের গঠন সাধারণত তিন ধরনের হয়: ২০টি তল বিশিষ্ট ইকোসাহেড্রাল, সর্পিলাকার হেলিকাল, এবং আরও জটিল গঠনের কমপ্লেক্স ভাইরাস (যেমন: স্মলপক্স)।

ভাইরাস এতটাই ক্ষুদ্র যে একে সাধারণ আলোক অনুবীক্ষণ যন্ত্রে দেখা যায় না। এদের আকার সাধারণত ৩০ থেকে ৪৫০ ন্যানোমিটারের মধ্যে হয়, যা একটি ব্যাকটেরিয়ার চেয়েও ১০০ থেকে ২০ গুণ ছোট।

ভাইরাস যেভাবে বংশবৃদ্ধি করে

ভাইরাস নিজে নিজে বংশবৃদ্ধি করতে পারে না বলে একে ‘পরজীবী’ বলা হয়। এর বংশবৃদ্ধির প্রক্রিয়া শুরু হয় ‘অ্যাবজরপশন’ বা শোষণের মাধ্যমে, যেখানে ভাইরাস একটি নির্দিষ্ট পোষক কোষের সাথে নিজেকে সংযুক্ত করে। এরপর এটি কোষের ভেতর প্রবেশ করে নিজের জেনেটিক উপাদান ছেড়ে দেয় এবং কোষের নিয়ন্ত্রণ দখল করে নেয়।

পোষক কোষটি তখন নিজের স্বাভাবিক কাজ বন্ধ করে ভাইরাসের নির্দেশে নতুন ভাইরাস প্রোটিন ও জেনেটিক উপাদান তৈরি করতে শুরু করে। কিছু ক্ষেত্রে, যেমন রেট্রোভাইরাস (যেমন HIV), ভাইরাস তার নিজস্ব নির্দেশনাবলী সরাসরি পোষক কোষের ডিএনএ-তে ঢুকিয়ে দেয়। যখন নতুন ভাইরাস কণা বা ভিরিয়ন তৈরি হয়ে যায়, তখন তারা কোষ ফেটে বেরিয়ে আসে এবং নতুন কোষকে আক্রমণ করে।

প্রাণী থেকে মানুষে: জুনোটিক রোগের ঝুঁকি

অনেক ভাইরাস কেবল নির্দিষ্ট প্রাণীতে সীমাবদ্ধ থাকলেও কিছু ভাইরাস প্রাণী থেকে মানুষের দেহে সংক্রমিত হতে পারে। একে বলা হয় জুনোটিক ভাইরাস। উদাহরণস্বরূপ, মশার মাধ্যমে ছড়ানো ওয়েস্ট নীল ভাইরাস বা ইঁদুরের মাধ্যমে ছড়ানো হান্তাভাইরাস। এছাড়া প্রিয়ন (প্রোটিন কণা) এবং ভিরোয়েড (আবরণহীন আরএনএ) এর মতো অপ্রচলিত সংক্রামক উপাদানগুলোও মানুষের জন্য মারাত্মক রোগের কারণ হতে পারে।

চিকিৎসা ও প্রতিরোধ

ভাইরাসের চিকিৎসা আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। যেহেতু ভাইরাস মানুষের কোষের ভেতরে অবস্থান করে, তাই পোষক কোষের ক্ষতি না করে ভাইরাসকে ধ্বংস করা অত্যন্ত কঠিন। একারণেই অ্যান্টিবায়োটিক ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কাজ করলেও ভাইরাসের বিরুদ্ধে কোনো ভূমিকা রাখতে পারে না।

ভাইরাস দমনে বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো প্রতিরোধ:

  • ভ্যাকসিন বা টিকা: টিকার মাধ্যমে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ভাইরাসের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়, যাতে ভবিষ্যতে আসল ভাইরাস আক্রমণ করলে শরীর দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারে।
  • স্বাস্থ্যবিধি: সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, মাস্ক ব্যবহার এবং আক্রান্ত ব্যক্তির থেকে দূরত্ব বজায় রাখা সংক্রমণ প্রতিরোধের প্রাথমিক উপায়।

ভাইরাস প্রতিনিয়ত নিজের রূপ পরিবর্তন বা মিউটেশন ঘটায়, যার ফলে পুরোনো টিকা অনেক সময় কার্যকর থাকে না। বিজ্ঞানীরা নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন নতুন নতুন ভ্যাকসিন এবং অ্যান্টিভাইরাল ড্রাগ তৈরির। জিন থেরাপিতে ভাইরাসের ব্যবহার থেকে শুরু করে মৌসুমি ফ্লু শট—সব মিলিয়ে ভাইরাসের সাথে আমাদের লড়াই ও সহাবস্থান চিরস্থায়ী। এই অদৃশ্য শত্রুদের সঠিকভাবে বোঝাই হলো জনস্বাস্থ্য রক্ষার প্রধান উপায়।

জনপ্রিয়

More like this
Related

শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী (রহঃ) : জীবন ও তৎপরতার সংক্ষিপ্ত রূপ

আরেফিন আল ইমরান সংক্ষিপ্ত আলোচনার মাধ্যমে একজন মহত্তম ব্যক্তিকে তুলে...

বাজার অস্থিরতা: কম্পিউটার এক্সেসরিজের হঠাৎ করে লাগামহীন দাম কেন? কবে ফিরবে স্বাভাবিক দামে ?

দেশের বাজারে কম্পিউটার এক্সেসরিজ বা ইলেকট্রিক পণ্যের বাজার হঠাৎ...

বিশ্বজুড়ে চিনির বিকল্প হিসেবে জনপ্রিয় হচ্ছে,ওষুধি গাছ ‘স্টেভিয়া’

অ্যাস্টার পরিবারের (Asteraceae) ফুলের উদ্ভিদ যা হচ্ছে স্টেভিয়া, (Stevia...