ইমাম আবু হামিদ মুহাম্মদ ইবনে মুহাম্মদ আল-গাজ্জালী (১০৫৮-১১১১ খ্রি.) ইসলামী দর্শন, তাসাওউফ এবং আধ্যাত্মিকতার ক্ষেত্রে এক অনন্য প্রতিভা ছিলেন। তিনি ইসলামী শিক্ষার পুনর্জাগরণ ঘটিয়ে একাধারে দার্শনিক, ফকিহ, সুফি এবং ধর্মতাত্ত্বিক চিন্তাবিদ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। তার রচিত গ্রন্থসমূহ বিশেষত ইহিয়া উলুম আদ-দীন, তাহাফুত আল-ফালাসিফা, মিশকাত আল-আনওয়ার, এবং কিমিয়া-ই-সা’দাত ইসলামী জ্ঞান এবং আধ্যাত্মিক দর্শনের ক্ষেত্রে অমূল্য সম্পদ।
ইমাম গাজ্জালীর জীবন ও দর্শনের আলোচনা থেকে বোঝা যায়, তিনি শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞানচর্চার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলেন না; বরং আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য তিনি জীবনযাপনেও তার শিক্ষা বাস্তবায়ন করেছিলেন। এই প্রবন্ধে, ইমাম গাজ্জালীর ইসলামী চিন্তা ও আধ্যাত্মিক জ্ঞানের বিভিন্ন দিক বিশদভাবে আলোচনা করা হবে।
১. ইসলামী চিন্তায় ইমাম গাজ্জালীর অবদান :
তাঁর চিন্তাকে সাধারণত তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়: ধর্মতাত্ত্বিক চিন্তা, নৈতিক শিক্ষা ও আত্মশুদ্ধির দর্শন।
ক. ধর্মতাত্ত্বিক চিন্তা ও দর্শন :
ইমাম গাজ্জালীর ইসলামী ধর্মতত্ত্বে যুক্তিবাদী পদ্ধতির প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। তার তাহাফুত আল-ফালাসিফা গ্রন্থে তিনি গ্রিক দর্শনের প্রতি কঠোর সমালোচনা করেন এবং মুসলিম দার্শনিকদের নিছক যুক্তির ওপর নির্ভরশীলতা থেকে সতর্ক করেন। তিনি বলেন, যুক্তি গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি ঈমানের বিকল্প হতে পারে না।
খ. ইসলামী শিক্ষা ও জ্ঞানের গুরুত্ব :
ইমাম গাজ্জালীর মনে করতেন, প্রকৃত জ্ঞান কেবলমাত্র বাহ্যিক শিক্ষা নয়; বরং এটি আত্মার পরিশুদ্ধির মাধ্যমে অর্জিত হয়। তিনি শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য কাজ করেন এবং শিক্ষা লাভের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেন: “জ্ঞান শুধুমাত্র দুনিয়াবি সাফল্যের জন্য নয়, বরং আখিরাতের মুক্তির জন্য হওয়া উচিত। জ্ঞান আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম। নৈতিকতা ও জ্ঞানের সমন্বয় অপরিহার্য। তার মতে, ইসলামী শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য হচ্ছে আত্মশুদ্ধি এবং ব্যক্তিগত ও সামাজিক উন্নয়ন।”
গ. নৈতিকতা ও আত্মশুদ্ধির গুরুত্ব :
ইমাম গাজ্জালী বিশ্বাস করতেন যে, মানুষের আত্মার তিনটি স্তর রয়েছে:
নাফস আল-আম্মারা (প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রিত আত্মা): যা কেবল ইন্দ্রিয়সুখ ও পার্থিব লোভ দ্বারা পরিচালিত হয়।
নাফস আল-লাওয়ামা (আত্মনিন্দিত আত্মা): যা ভালো-মন্দের মধ্যে সংঘর্ষ করে এবং নিজের ভুল বুঝতে চেষ্টা করে।
নাফস আল-মুতমাইন্নাহ (শান্ত আত্মা): যা আধ্যাত্মিক প্রশান্তি লাভ করে এবং আল্লাহর পথে স্থির থাকে।
তিনি আত্মার উন্নতির জন্য কুরআন, হাদিস, ইবাদত, এবং ধ্যানচর্চার উপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
২. আধ্যাত্মিক জ্ঞানে ইমাম গাজ্জালীর দৃষ্টিভঙ্গি :
ইমাম গাজ্জালী তার জীবনের একটি পর্যায়ে পার্থিব প্রতিষ্ঠা ত্যাগ করে আধ্যাত্মিক জ্ঞানের সন্ধানে যাত্রা করেন। তিনি সুফিবাদের প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট হন এবং আত্মশুদ্ধিকে ইসলামের মূল শিক্ষা হিসেবে বিবেচনা করেন।
ক. আধ্যাত্মিক জীবন :
তিনি বলেন, “ইসলামের প্রকৃত রূপ বোঝার জন্য শুধুমাত্র বাহ্যিক অনুশীলন যথেষ্ট নয়; বরং আত্মার পরিশুদ্ধি, ধ্যান এবং আধ্যাত্মিক জ্ঞানের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা সম্ভব।” তার মতে, আত্মিক উন্নতির জন্য কিছু প্রধান বিষয় অপরিহার্য:
তওবা ও আত্মশুদ্ধি: সত্যিকারের তওবা মানুষকে পাপমুক্ত করতে সাহায্য করে যিকির ও আল্লাহর স্মরণ: এটি অন্তরের পরিশুদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। মুরাকাবা (ধ্যান ও আত্মসচেতনতা): আধ্যাত্মিক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয়।
খ. এহইয়াউ উলুম আদ-দীন – আধ্যাত্মিক দিকনির্দেশনা :
এই গ্রন্থে তিনি আত্মার উন্নতি ও ইবাদতের গভীর তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেছেন। চারটি খণ্ডে বিভক্ত এই গ্রন্থে আলোচনা করা হয়েছে:
ইবাদত ও উপাসনার গুরুত্ব
নৈতিকতা ও সামাজিক আচরণ
আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক জ্ঞান
পাপ ও অনৈতিকতার ক্ষতি
ক. নৈতিক ও সামাজিক জীবনে তার শিক্ষা :
বর্তমান বিশ্বে ইমাম গাজ্জালীর নৈতিক শিক্ষা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। আজকের সমাজে ব্যক্তিগত এবং সামাজিক জীবনে যে নৈতিক সংকট দেখা যাচ্ছে, তা থেকে উত্তরণের জন্য তার শিক্ষা অনুসরণ করা যেতে পারে। ইমাম গাজালির আবির্ভাব ঘটে পঞ্চম শতাব্দীর মধ্যভাগে, যখন পাশ্চাত্য ও গ্রিক দর্শন বিস্তার লাভ করেছে। তিনি ধর্ম ও দর্শনের মধ্যে পার্থক্য দেখান এবং ধর্মকে দর্শনের ওপর প্রাধান্য দেন। ইমাম গাজ্জালীর একমাত্র বিশ্বাস ও অবস্থান ছিল, ওহি বা নবুয়তি চিন্তাধারা মানুষের সমস্ত আকল বা বুদ্ধির ঊর্ধ্বে। তিনি বলেছেন, ওহি ছাড়া কোনো দার্শনিক মতবাদ কখনো ধর্মীয় চিন্তার ভিত্তি হতে পারে না। কারণ, ইন্দ্রিয়ানুভূতি ও প্রজ্ঞার জ্ঞান প্রতারণামূলক হতে পারে। তাঁর মতে, দূরকল্পী কোনো যুক্তির সাহায্যে কোনো দার্শনিক মতবাদ প্রমাণ করা যায় না। জনসাধারণের ধর্মবিশ্বাসকে যুক্তিবিজ্ঞানের সাহায্যে বিন্যস্ত কতগুলো আকাইদ সূত্রে পরিণত করার প্রবণতাকে প্রকাশ্যভাবে নিন্দা করেন। একজন প্রাজ্ঞ দার্শনিক পরিচয়ে ইউরোপীয়রা তাঁকে পরিচিত করাতে চাইলেও গাজ্জালী দর্শনকেও সরাসরি আক্রমণ করেছেন। বলেছেন, দর্শন নিছক একটি চিন্তাধারা। যে কেউ তা উপলব্ধি করতে সক্ষম। মধ্যযুগীয় দার্শনিক চিন্তার প্রভাব থেকে মুক্ত করে মুসলিমদের কোরআন-হাদিসের শিক্ষায় ফিরিয়ে আনার কারণেই তাঁকে ‘হুজ্জাতুল ইসলাম’ বলা হয়।

অনেক বিশেষজ্ঞ ও দার্শনিকের মতো ইমাম গাজ্জালী এই বিশ্ব বা ক্ষণস্থায়ী অস্তিত্ব সৃষ্টিকর্তা কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত,−এটি কোনো আইন বা সরকার কর্তৃক পরিচালিত নয়। তাঁর মতে, তিনি কেবল বিশ্বই সৃষ্টি করেননি, বরং বিশ্বের প্রতিটি ছোট-বড়, অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ বিষয়েরও স্রষ্টা ও নিয়ন্ত্রক। সমাজ সম্পর্কে তাঁর ভাবনা হলো, সমাজ মানুষের তৈরি। সমাজের কেবল মন্দ বিষয়গুলো পরিবর্তন করতে হয়। মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সমাজের প্রতি দায়িত্ব পালন করার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত অধিকারের চেয়ে দলগত অধিকারকে সমাজে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। সমাজে মৌলিকভাবে দুটি শ্রেণি থাকে—শাসক ও শাসিত। শাসকশ্রেণি চিন্তাভাবনা করে এবং জনসাধারণ সম্পূর্ণভাবে তা মেনে নেয়। সাধারণ মানুষের কোনো নিজস্ব রুচি নেই, তারা শুধু সমাজের নিয়মকানুন মেনে চলে। সর্বোপরি সৃষ্টিকর্তা পুরো সমাজের নিয়ন্ত্রক এবং পথনির্দেশক।
মানুষ সম্পর্কে তিনি বলেছেন, সচেতনতা ও প্রজ্ঞা মানুষের খুব গুরুত্বপূর্ণ দুটি বৈশিষ্ট্য। প্রজ্ঞার দুটি উৎস রয়েছে—একটি হলো মানুষের অনুভূতি এবং বুদ্ধি-বিবেচনা, যা আদতে খুব অল্প। এটা হলো পৃথিবীতে শুধু বসবাসের জন্য একজন মানুষ যা নিজ উদ্যোগে জেনে নেয়। অন্যটি হলো উৎসাহ,−যা বিশ্বকে জানার জন্য কার্যকর। উৎস-পদ্ধতির আলোকে এই দুটি উৎসকে অবশ্যই সমানভাবে দেখতে হবে। তবে সত্যিকারের জ্ঞান শুধু অনুশীলন ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই অর্জিত হয়।
ইমাম গাজ্জালীর চিন্তা অনুযায়ী মানুষ ধর্মপরায়ণ। এটা ঠিক যে দারিদ্র্যের জন্য সম্পদ এবং ক্ষুধার জন্য পেটভর্তি খাবারেরও প্রয়োজন হয় তার। তবে মানুষ যে ধার্মিক,−এই বিষয়টি সৃষ্টিগতভাবে গড়ে ওঠে, আধিপত্যের ওপর ভিত্তি করে নয়। মানুষের অভ্যাসগুলো সংগ্রামের চেয়ে ধৈর্যের ওপর বেশি নির্ভর করে।
খ. বিজ্ঞান ও ধর্মের সমন্বয় :
ইমাম গাজ্জালী ধর্ম ও বিজ্ঞানের মধ্যে সামঞ্জস্য সাধন করার পক্ষে ছিলেন। তার মতে, বিজ্ঞান ও যুক্তি ইসলামের পরিপন্থী নয়, বরং সঠিকভাবে ব্যবহৃত হলে এটি ঈমানকে আরও শক্তিশালী করে।
গ. মানসিক স্বাস্থ্য ও আত্মিক প্রশান্তি :
মানসিক উদ্বেগ, হতাশা ও আত্মিক অসন্তুষ্টির এই যুগে ইমাম গাজ্জালী আধ্যাত্মিক শিক্ষা মানুষের জন্য পথপ্রদর্শক হতে পারে। তিনি দেখিয়েছেন, প্রকৃত শান্তি কেবলমাত্র আল্লাহর প্রতি আস্থা ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে অর্জিত হয়।
শিক্ষার নীতি ও লক্ষ্যসম্পর্কিত দর্শন :
ইমাম গাজ্জালীর দর্শনের মূল সুর হল আত্মিক বিষয়ে অভিব্যক্তি প্রকাশ করা। শিক্ষা বিষয়ে তাঁর বিশেষ মতাদর্শ হলো, শিক্ষাকে গতিশীল, পরিবর্তনের মধ্যেও টেকসই এবং নতুন কিছু উদ্ভাবন করার সক্ষম হতে হবে। তিনি সমাজের জন্য যে শরিয়াহ চালু করেছিলেন, তার লক্ষ্য ছিল, মানুষ যেন তার সৃষ্টিকর্তার সান্নিধ্যসুখ লাভ করতে পারে। এ কারণে তাঁর শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো, মানুষ যেন এমনভাবে জ্ঞান অর্জন করে, যাতে ধর্মীয় নিয়ম-নীতি সুচারুরূপে মেনে পার্থিব ও পরকালীন উভয় জগতে সে সুখী হতে পারে। অন্যান্য পার্থিব লক্ষ্য, যেমন−সম্পদ উপার্জন, সামাজিক অবস্থান বা শক্তি অর্জন এবং জ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা—এ এসবই মায়াছায়া, যেহেতু এগুলো শুধু ক্ষণস্থায়ী জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাঁর মতে, প্রাকৃতিকভাবে শৈশবকালে শিশুরা বুঝতে পারে না কোন ধরনের কথা বলা উচিত এবং কোনটা উচিত নয়। তাই এ সময় তাদের কোনো পাপ হয় না। পরিবার, বিশেষত, মা-বাবা তাকে শেখায় কোথায়, কখন, কীভাবে কথা বলতে হয়। শিশুরা পরিবারের মাধ্যমে প্রভাবিত হয়, সংস্কৃতি শেখে, নৈতিকতা শেখে এবং এমনকি প্রতিবেশ বোঝে তারা পরিবারের মাধ্যমে। সুতরাং শিশুর শিক্ষার জন্য দায় হলো পরিবারের। সেই দায়ের খানিকটা রয়েছে প্রাথমিক শিক্ষালয়ের শিক্ষকেরও। শিশুর তাই প্রধান শিক্ষার বিষয় হবে নৈতিকতা এবং শিক্ষকের প্রধান কাজ হলো তাকে চরিত্রবান করে বেড়ে ওঠার পথ দেখিয়ে দেওয়া।
‘রাজনীতি, অর্থনীতি ও নীতি শাস্ত্র’ : এ তিনটি বিজ্ঞান পরস্পরের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে বিজড়িত। অর্থনীতি মানুষের প্রাণীসূলভ চিন্তার সাথে জড়িত। এর সাহায্যে মানুষ মস্তিষ্ক খাটিয়ে বস্ত্তগত লাভ-ক্ষতি চিন্তা করে। নীতি শাস্ত্র আত্মা, বিবেক ও অন্তরের সাথে জড়িত। এর মাধ্যমে মানুষ ভাল-মন্দ বিচার করে এবং এর নৈতিক পরিণতি সম্বন্ধে ভাবে। আর রাজনীতি কোন বস্ত্ত বা পন্থা সম্বন্ধে চিন্তা-ভাবনার পর তা আহরণ বা বর্জন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং উপায় উদ্ভাবন নিয়ে ব্যাপৃত থাকে। অধিকন্তু রাজনীতির প্রাথমিক গুরুত্বের কারণ, রাজনীতি সঠিকভাবে প্রতিষ্ঠিত না হ’লে, অর্থনীতি ও নীতি শাস্ত্র অচল হয়ে পড়ে এবং ধর্ম-কর্ম ও সমাজ জীবন বাধাগ্রস্ত হয়। পক্ষান্তরে ইবনে সীনা, তার ‘আকসামুল উলূম’ (জ্ঞান-বিজ্ঞানের শ্রেণী বিভাগ) গ্রন্থে এ ত্রি-বিজ্ঞানকে ‘নীতি শাস্ত্র, অর্থশাস্ত্র, রাজনীতি বিজ্ঞান’ রূপে শ্রেণী ভাগ করেন, যা এ্যরিষ্টটলের বিভক্তির অনুরূপ।
এ ব্যাপারে উভয়ের উপর এ্যরিষ্টটলের প্রভাব সুস্পষ্ট। কিন্তু এ্যরিষ্টটলের নিছক ইহ জাগতিক ভাবধারাকে সংশোধন করে আল-ফারাবী মানুষের জীবনের আদর্শকে ইহ ও পর জাগতিক বা উভয় জগতের সুখ অর্জনের লক্ষ্য রূপে স্থির করেছিলেন। ইমাম গাজ্জালী, আল-ফারাবীর সাথে সুর মিলিয়ে বলেন, ‘রাজনীতি ত্রয়ী প্রায়োগিক বিজ্ঞানের প্রথম বিজ্ঞান হিসাবে ইহজগতে মানুষের কল্যাণ ও পরজগতে সুখ অর্জন করার লক্ষ্যে নিয়োজিত হয় এবং তা অর্জন করা সম্ভবপর হয় যখন সরকার শরী‘আতের শাস্ত্রের উপর প্রতিষ্ঠিত হয় ও রাজনীতি শাস্ত্রের দ্বারা পূর্ণতা লাভ করে।
তাঁর ‘কিতাবুল ইক্বতিছাদ ফিল ই‘তিক্বাদ’ গ্রন্থে তিনি মুসলিম সমাজের চত্বরে রাজনীতির ভূমিকা সম্বন্ধে আলোচনা করেন এবং ইসলামের প্রেক্ষাপটে রাজনীতিকে নেতৃত্বের সাথে সম্পৃক্ত করেন। এতে তিনি ইমাম মাওয়ার্দীর মতই নেতৃত্ব বা ‘ইমামত’কে ‘খিলাফত’ রূপে চিহ্নিত করেন। তিনি বলেন, ‘ইমামত শরী‘আতের অঙ্গ, যা সাধারণ ব্যবহারিক বিষয়বস্ত্ত (মুহিম্মাত) থেকে স্বতন্ত্র এবং নিছক পদার্থ-অতীত অধিবিদ্যা সম্মত চিন্তার আওতাভুক্ত নয়। অতএব গ্রীকদের রাজনীতি চিন্তার আলোকে ইমামতের বিষয়াদি পরীক্ষা করার কোন অধিকার দার্শনিকদের নেই।
তিনি বলেন, ‘এটি নিছক যুক্তিলব্ধ (জ্ঞানপ্রসূত) নয়; বরং শরী‘আতসম্মত চিন্তার ফসল’। তাই তিনি তাঁর অনন্য গ্রন্থ ‘মাক্বাছিদুল ফালাসিফা’-তে বলেন, রাজনীতি ত্রয়ী প্রায়োগিক (সমাজ) বিজ্ঞানের প্রথম বিজ্ঞান রূপে ‘দুনিয়াতে মানুষের কল্যাণ সাধন ও পরকালে সুখ অর্জনের লক্ষ্যে নিবেদিত, যা সরকারকে শরী‘আতের উপর সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে রাজনীতি বিজ্ঞান দ্বারা পূর্ণতা লাভের প্রচেষ্টার দ্বারা লাভ করা যায়’।
ইমাম গাজ্জালীর শ্রেষ্ঠ অবদান ‘এহইয়াউ উলূমিদ্দীন’ অর্থাৎ ধর্মীয় বিজ্ঞানাদির পুনরুজ্জীবন গ্রন্থে ধর্মকে প্রাণবন্ত ও সমাজকে সচল করতে গিয়ে, তিনি সমাজে শৃংখলা রক্ষা ও শান্তি প্রতিষ্ঠার তাকীদে রাজনীতিকে বাস্তবতার নিরিখে মূল্যায়ন করার প্রয়াস পান। রোজেনথালের মতে, এক্ষেত্রে তাঁর ইমামত সম্পর্কীয় দৃষ্টিভঙ্গী অভিজ্ঞতাপ্রসূত বাস্তবতায় পর্যবসিত। তিনি যে সময়ে লিখেছিলেন, তখন বাগদাদে আববাসীয় খলীফা ছিলেন অল্প বয়স্ক আল-মুসতাযহির বিল্লাহ। তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৬ বছর। এ অবস্থায় তিনি খলীফাকে নিজস্ব খেয়াল খুশীমত শাসনকার্য পরিচালনা না করে আলেমদের সাথে পরামর্শ করে শাসনকার্য পরিচালনা করার উপদেশ দেন এবং এর ভিত্তিতে রাজনীতির বাস্তবতা স্বীকার করে অনুপেক্ষণীয় প্রয়োজনের খাতিরে খলীফার গুণাবলীর শর্তের ব্যাপারে কিছুটা শিথিলতা অবলম্বন করার উদ্যোগ নেন।
অবশেষে খলীফা মুসতাযহির-এর উপদেশের উদ্দেশ্যে রচিত তাঁর রাজনীতির গ্রন্থ ‘কিতাবুল-মুসতাযহিরী’তে তিনি ইমাম মাওয়ার্দী কর্তৃক প্রদত্ত ইমামত বা খিলাফতের শর্তাবলীতে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী উপস্থাপন করেন।
প্রথমতঃ তিনি বলেন, এটা সর্বজন স্বীকৃত যে, প্রশাসনিক দক্ষতা ব্যতিরেকে খিলাফত চলে না, কিন্তু খলীফা যদি নিজ হস্তে প্রশাসন নির্বাহ না করে কোন দক্ষ প্রশাসককে মন্ত্রী নিযুক্ত করে তাঁর হাতে প্রশাসনের ক্ষমতা হস্তান্তর করেন, তবে খলীফার নিজের প্রশাসনিক দক্ষতার পরিবর্তে মন্ত্রীর দক্ষতাই যথেষ্ট। এরূপ অবস্থায় খলীফার যোগ্যতাসম্পন্ন হ’তে প্রশাসনিক দক্ষতার শর্ত শিথিল করা যায়।
দ্বিতীয়তঃ অনুরূপভাবে খলীফা যদি জ্ঞানী নাও হন, কিন্তু শরী‘আতের হুকুম-আহকাম চালু করার ব্যাপারে যদি আলেমদের পরামর্শক্রমে সমস্ত কর্ম সমাধা করেন, তাতে তাঁর জ্ঞানী হওয়ার শর্ত আলেমদের জ্ঞানের দ্বারা পূর্ণ হবে। অতএব এমতাবস্থায় খলীফার যোগ্যতার ব্যাপারে জ্ঞানী হওয়ার শর্ত শিথিল করা যায়।
তৃতীয়তঃ যখন খলীফার শাসনকার্য, প্রশাসনিক দক্ষতা সম্পন্ন ওয়াযীরের দ্বারা সমাধা হয় এবং শরী‘আতের হুকুম-আহকাম ও বিচারকার্য চালু করার কাজ শরী‘আতের জ্ঞানে সুদক্ষ আলেমদের দ্বারা নির্বাহ হয়, সে অবস্থায় খলীফার যোগ্যতার ব্যাপারে প্রাপ্ত বয়সের বাধ্য বাধকতার শর্ত শিথিল করা যায়। এরূপ শর্ত-শিথিলতার পক্ষ অবলম্বন করার বিশেষ কারণ ছিল ইমাম ইমাম গাজ্জালীর সময়কালে যখন অল্প বয়ষ্ক ও দুর্বল মুসতাযহির বাগদাদে খিলাফতের আসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন, তখন একদিকে সেলজুক সুলতানেরা মহা পরাক্রমশালী ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন, যারা সুন্নী মতাবলম্বী ছিলেন এবং বাগদাদের আববাসীয় সুন্নী খিলাফতের সংরক্ষণের জন্য তৎপর ছিলেন। তাঁদের ছত্রছায়ায় মুসতাযহির নাম মাত্র খলীফার আসন অলংকৃত করছিলেন।
আর অন্যদিকে সাত ইমামী শী‘আ মতাবলম্বী বাতেনী সম্প্রদায়, যারা বাগদাদের খিলাফতের প্রতিদ্বন্দ্বী কায়রোর সাত ইমামী শী‘আ মতাবলম্বী ফাতেমী খলীফাদের ভক্ত ছিল এবং সে সুবাদে আববাসীয় খিলাফতের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে বসেছিল, এ অবস্থায় সেলজুক সুলতান মালিক শাহের অনুরোধে ইমাম গাজ্জালী বাতেনীদের মতবাদ গভীরভাবে অধ্যয়ন করেন ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে বাতেনীদের মতবাদ খন্ডন করে একটি পুস্তক রচনা করেন এবং তাঁর ‘কিতাবুল ইক্বতিছাদ ফিল-ই‘তিক্বাদ’ এ তিনি খলীফা ও সুলতানের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার উপর জোর দেন।
লিউনার্ড বাইনার বলেন, “ইমাম ইমাম গাজালির রাজনীতি চিন্তায় সুলতানের ক্ষমতার ভূমিকার অবতারণা করার কারণ হ’ল, যদিও ইমামত প্রতিষ্ঠার জন্য শরী‘আত অনুসারে ইজমা-ই যথেষ্ট, তবুও মান্যবর ইমাম অর্থাৎ যাঁকে লোকেরা স্বভাবতই মান্য করে বা মানতে বাধ্য হয় এমন ইমামের অবস্থিতি ছাড়া ইজমা কার্যকর হয় না। অতএব সুলতানের ক্ষমতার দাপট ও সমর্থন প্রয়োজন। তাই এহইয়াউ উলূমিদ্দীনের মধ্যেও তিনি সুলতানকে কার্যকরী শাসক হিসাবে গণ্য করেন।”
অধিকন্তু ইমামের বৈধ ও অবৈধ কর্তৃত্ব সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে ‘এহইয়া’-তে তিনি ঘোষণা করেন যে, ‘আমীরে ইসতি‘লা’ বা সামরিক সরকার যদিও মূলতঃ ক্ষতিকর, তথাপি এদের সাথে সহযোগিতা করা প্রয়োজন। যাতে তাদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা না দেয় ও সমাজকে গৃহ যুদ্ধে নিপাতিত না করে।
তিনি দৃঢ়ভাবে এমত পোষণ করেন যে, যেকোন মূল্যে সভ্য মানুষের পক্ষে গৃহযুদ্ধ ও অরাজকতা থেকে বেঁচে থাকা প্রয়োজন। কেননা এক দিনের অরাজকতা হাযার বছরের সভ্যতাকে ধ্বংস করতে পারে। অতএব তাঁর মতে, অরাজকতার ভয়াবহ পরিণতির চেয়ে স্বৈরাচারী শাসকের কিয়ৎ পরিমাণ অত্যাচার সহ্য করা মন্দের ভাল হিসাবে শ্রেয়।
তাঁর শাসনকর্তাদের প্রতি উপদেশের গ্রন্থ ‘আত-তিবরুল মাসবূক’, যা জাহিয-এর কিতাবুত তাজ এবং নিযামুল-মুলক তূসীর ‘সিয়াসতনামা’র নমুনায় লিখিত, তাতে ইমাম গাজ্জালী বাদশাহীত্ব বা রাজত্ব আল্লাহর দান ও ন্যায় বিচারের উপর প্রতিষ্ঠিত বলে প্রমাণ করেন এবং শত শত উপমা, উদাহরণ ও বাস্তব ঘটনা বর্ণনা করে বাদশাদেরকে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হয়ে ন্যায়বিচারের দিকে উদ্বুদ্ধ করার প্রয়াস পান।
লক্ষণীয় যে, ‘কিতাবুল ইক্বতিছাদ’-এ তাঁর আলোচ্য বিষয়ের কেন্দ্রবিন্দু ছিল ইমামত ও খিলাফত। ‘এহইয়াউ উলূম’ এবং ‘মুস্তাযহিরী’তে তিনি খলীফা ও সুলতানের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা কামনা করেন। বিশেষতঃ সেলজুক সুলতানদের দ্বারা খিলাফতের প্রতিষ্ঠানকে মুসলিম সমাজের একতার প্রতীক স্বরূপ একটি সাংবিধানিক কেন্দ্রবিন্দুতে রূপায়িত করার প্রচেষ্টার প্রতি তিনি আকৃষ্ট হন এবং সবার দৃষ্টি ইমামতের প্রতীকী প্রতিষ্ঠান থেকে, ইমাম বা খলীফার নিরাপত্তা বিধানকারী ক্ষমতাধর সুলতানের প্রতি ফিরাতে ও নিবদ্ধ করতে তিনি চেষ্টিত হন। আর ‘আত-তিবরুল মাসবূক’-এ তাঁর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু সুলতান থেকে ‘মুলক’ বা রাজত্বে অর্থাৎ বাদশাহীতে পরিবর্তিত করেন। প্রণিধানযোগ্য যে, সুলতান মৌল অর্থে প্রাপ্ত ক্ষমতা, তথা আল্লাহর নিকট থেকে রাসূল কর্তৃক প্রাপ্ত এবং রাসূলের নিকট থেকে খলীফা কর্তৃক প্রাপ্ত ও খলীফার নিকট থেকে প্রশাসক বা শাসনকর্তা কর্তৃক প্রাপ্ত। তাই এতে স্তরে স্তরে শাসনকার্য পরিচালনার শর্তাবলী থাকে। কিন্তু মুলক বা রাজ্যের বেলায় তথা বাদশাহীতে উক্ত শর্তাবলীর ইঙ্গিত নেই। রাজার বা বাদশার ক্ষমতা মৌলিক বলে মনে করা হয়।

তাঁর রাষ্ট্র দর্শন :
ইমাম গাজ্জালী তাঁর ‘ইক্বতিছাদ’-এ বলেন, ইমামত, তথা মুসলিম সমাজের নেতৃত্ব, শরী‘আতের আওতাধীন বা নিছক অভিজ্ঞতালব্ধ বুদ্ধিগত ব্যাপার (মুহিম্মাত) অথবা যুক্তি ও অধিবিদ্যা ভিত্তিক। চিন্তা-ভাবনার ফলশ্রুতি থেকে স্বতন্ত্র।
অতএব গ্রীক দর্শনের আদলে ইমামতের স্বরূপ ও প্রকৃতি পরীক্ষা করার কোন অধিকার বা অবকাশ দার্শনিকদের নেই। কেননা ইমামত বা মুসলিম সমাজের ও রাষ্ট্রের নেতৃত্ব যুক্তির চিন্তালব্ধ নয়; বরং নবুঅতের ঐতিহ্য সূত্রে প্রাপ্ত ও শরী‘আতের অনুশাসন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত।
কিতাবুল মুসতাযহিরীতে তিনি একথার পুনরাবৃত্তি করে বাতেনী ও দার্শনিকদের এ দাবী যে, ইমামত একটি যুক্তিগত ভাবে অপরিহার্য প্রতিষ্ঠান, তথা যুক্তিলব্ধ প্রতিষ্ঠান। কেননা তাদের মতে অন্যান্য জনগোষ্ঠীর মতই মুসলিম সমাজ যুক্তিগতভাবে নেতৃত্ব বা ইমামতের বাধ্য করার শক্তি সম্পন্ন নেতৃত্বের প্রতিষ্ঠান ছাড়া শান্তিতে বসবাস করতে পারে না… এ ধারণাটি খন্ডন করেন।
ইমামত শরী‘আতের আওতাভুক্ত হওয়ার ধারণায় তিনি ইমাম মাওয়ার্দীর সাথে ঐক্যমত পোষণ করেন। উভয়েই উল্লেখ করেন যে, রাসূলে আকরাম (সাঃ) এর ইন্তেকালের পর প্রথম যুগের মুসলমানরা হযরত আবু বকর (রাঃ)-কে এমনকি নবী করীম (সাঃ)-এর মৃতদেহ দাফন করার পূর্বেই নেতা নির্বাচিত করেন। আর তখন থেকে ইজমা ভিত্তিক মুসলিম ঐতিহ্যের ভিত্তিতে মুসলমানদের মধ্যে ঐক্যমত চলে আসছে যে, সরকারী কর্মকান্ড ও বিচার-আচারের প্রক্রিয়ার বৈধতা একজন সর্বজন স্বীকৃত ইমামের নিকট থেকে উৎসারিত হ’তে হবে।
কিতাবুল মুসতাযহিরীতে ইমাম গাজ্জালী বলেন, ‘মুসলিম সমাজের বা উম্মাহর নেতৃত্বের জন্য ইমামতের প্রয়োজন। কেননা এটা সুবিধাজনক ও কল্যাণকর প্রতিষ্ঠান, যা এ দুনিয়ার জীবনে ক্ষতি থেকে মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। বরং এটা মুসলমানদের জীবনে একটি অপরিহার্য প্রতিষ্ঠান। কারণ এটা উম্মতের ইজমা দ্বারা প্রবর্তিত। কেননা রাসূলে আকরাম (সাঃ) এর ইন্তেকালের পর ইসলামের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ব্যবস্থা কায়েম ও চালু রাখার জন্য একজন ইমাম নিযুক্ত করার অপরিহার্য প্রয়োজন দেখা দেয়’।
তিনি আরো বলেন, ‘প্রণিধানযোগ্য যে, উম্মতের ইজমা বা ঐক্যমত, যা ইসলামে আইন-কানূনের একটি উৎস, তা একজন সর্বসাকুল্যে মান্যবর ইমামের নেতৃত্বে ছাড়া ইসলাম ধর্মকে ও এর কল্যাণকর জীবন ব্যবস্থাকে সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়’। ধর্ম ও রাজনীতি একই উৎস মূলে দু’টি সত্তা। কেননা ধর্মের মৌল বাহন হ’ল ইবাদত, যা তাক্বওয়ার উপর চলে এবং রাজনীতির মৌল বাহন হ’ল হিকমত, যা কৌশলের উপর চলে। ইবাদত কৌশলের ভিত্তিতে করা যায় না এবং রাজনীতি বা সিয়াসাত তাক্বওয়ার ভিত্তিতে অচল। কিন্তু উভয়ই সৎ উদ্দেশ্যের (মাওয়েযাতুল হাসানার) ভিত্তিতে পরিচালিত হ’তে হবে। তাই উভয়েরই উৎস এক তথা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে নিবেদিত।
সুতরাং ইমাম ইমাম গাজ্জালীর প্রথম কথা হ’ল : মুসলিম উম্মাহর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ইমামত অপরিহার্য এবং ইমাম নির্বাচন করা প্রত্যেক মুসলমানের ধর্মীয় কর্তব্য। এই নির্বাচনকার্য একটি সম্মিলিত কর্তব্য বা ফরযে কিফায়াহ। যা ‘আহলুল হাল্লে ওয়াল-আক্দ’ কর্তৃক নির্বাচিত হয়ে জনসাধারণের বায়‘আত গ্রহণ করার মাধ্যমে, ইজমার ভিত্তিতে সম্পন্ন হয়। তিনি এ ব্যাপারে ইমাম মাওয়ার্দীর সাথে একমত।
তাঁর দ্বিতীয় কথা হ’ল, ইমামত যেহেতু রাসূলে আকরাম (সাঃ)-এর খিলাফত বা প্রতিনিধিত্ব অর্থাৎ ‘খিলাফত নবুঅতের প্রতিনিধিত্ব হওয়ার কারণে খলীফার কতগুলি বিশেষ গুণের প্রয়োজন, যাতে তিনি তাঁর ক্ষমতাধীন জনসাধারণকে শরী‘আতের নির্ধারিত লক্ষ্যের দিকে সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারেন। এ ব্যাপারে তিনি নীতিগতভাবে ইমাম মাওয়ার্দীকে অনুসরণ করেন। কেবল তার যুগের চাহিদা পূরণ করার জন্য কোন কোন ক্ষেত্রে ইমামতের শর্তগুলি কিয়ৎ পরিমাণ শিথিল করেন মাত্র।
কিতাব আল-মুসতাযহিরীতে ইমাম গাযালী অনুরূপ কতেক গুণাগুণ ও শর্তাবলীর অবতারণা করেন। তন্মধ্যে ছয়টি দৈহিক ও চারটি নৈতিক, যথা- (১) বয়োপ্রাপ্তি (২) সুস্থ মস্তিষ্ক (৩) স্বাধীনতা (৪) পুরুষ হওয়া (৫) কুরায়শী হওয়া (৬) সুস্থ দৃষ্টিশক্তি ও শ্রবণশক্তি সম্পন্ন হওয়া এবং (১) সাহসিকতা (২) প্রশাসনিক দক্ষতা (৩) আল্লাহভীরুতা (৪) শরী‘আতের জ্ঞান।
তবুও আল-মুসতাযহিরের অপ্রাপ্ত বয়স্ক ও সেলজুকদের মোকাবিলায় দুর্বল হওয়া সত্ত্বেও ইমাম গাযালী জোর দিয়ে তাঁকে প্রকারান্তরে সবগুণের অধিকারী বলে মতামত ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, প্রথমতঃ তাঁর কুরাইশী বংশ সঠিক, পক্ষান্তরে মিসরের ফাতেমী খলীফাদের কুরাইশী বংশ তালিকা মেকী।
দ্বিতীয়তঃ সাহসিকতা ও সামরিক ক্ষমতার অধিকারী হওয়ার ব্যাপারে, তিনি বলেন, সেলজুক সুলতানের আনুগত্য ও সামরিক শক্তির সহায়তা এবং খলীফার প্রতি সমর্থন এর জন্য যথেষ্ট। এমনকি কখনো কখনো খলীফার প্রতি তাদের অবাধ্যতা প্রদর্শন বা তাদের অধিকারের সীমালংঘন ঘটে থাকলেও খলীফার প্রতি তাদের আনুগত্য অবিচল। কেননা তারা খলীফাকে রক্ষা করা তাদের ধর্মীয় কর্তব্য বলে বিশ্বাস করেন। ইতিপূর্বে খলীফা কখনো এরূপ একটি সহায়ক শক্তি নিজেদের সান্নিধ্যে পাননি।
তৃতীয়তঃ প্রশাসনিক দক্ষতার ব্যাপারে তিনি বলেন, খলীফা মুসতাযহির বিচক্ষণতা ও দৃঢ় চিত্ততার স্বাক্ষর রেখেছেন এবং তাঁর মন্ত্রী এবং উপদেষ্টাদের পরামর্শ গ্রহণ করার সদিচ্ছার প্রমাণ দিয়েছেন।
চতুর্থতঃ আল্লাহভীরুতা বা ধর্মভীরুতার ব্যাপারে আন্তরিকতা যা মানুষের সর্বোচ্চ গুণ বলে পরিগণিত হয়, তা আল-মুসতাযহিরের মধ্যে সততই বিদ্যমান। তিনি পুণ্যময় রীতিনীতি ও কৃচ্ছতা সহকারে ব্যক্তিগত জীবন যাপন করেন এবং সক্রিয়ভাবে ইসলামী কর্তব্য ও অনুষ্ঠানাদি পালন করেন। তিনি সরকারী তহবিল, একমাত্র অনুমোদিত সরকারী ও ধর্মীয় খাতে ব্যয় করেন। তিনি বলেন, যদিও তাঁকে দোষ-ত্রুটির ঊর্ধ্বে বলা যায় না, যেমন বাতেনী সম্প্রদায় তাদের ইমামের নিকট প্রত্যাশা করে, যেরূপ প্রত্যাশা করা অবশ্যই মানব প্রকৃতির বিপরীত হবে। এমনকি বিজ্ঞ লোকেরা দোষ-ত্রুটি মুক্ত হওয়ার ব্যাপারে নবীদের পক্ষেও কি পরিমাণ সম্ভব তা নিয়ে বিতর্কে লিপ্ত হন।
পঞ্চমতঃ জ্ঞানসম্পন্ন হওয়ার ব্যাপারে ইমাম ইমাম গাজ্জালী ‘মুজতাহিদ’ হওয়ার জন্য অতি উচ্চ ধর্মীয় জ্ঞান ও ফিক্বহ বিদ্যার প্রয়োজন আছে বলে মনে করেন না। বরং ইমামতের জন্য ফৎওয়া বা ফিক্বহ সম্মত রায় প্রদান করার যোগ্যতাই যথেষ্ট বলে তিনি মনে করেন।
তিনি স্বীকার করেন যে, আল-মুসতাযহির একজন যুবক মাত্র এবং মুজতাহিদ-এর যোগ্যতা সম্পন্ন নন। কিন্তু তিনি প্রশ্ন করেন, কুরাইশ বংশীয় অনুরূপ মর্যাদা সম্পন্ন অন্য কোন প্রার্থী তাঁর মত আছে কি? অতএব আল-মুসতাযহির এর ইমামতের বৈধতা একদিকে জনগণের স্বীকার করে নেয়া উচিত এবং অন্যদিকে তাঁর পক্ষে সমস্ত সন্দেহজনক বিষয়ে সর্বাধিক বিজ্ঞ আলেমদের পরামর্শ গ্রহণ করা বিধেয়। যাতে তাঁর ধর্মীয় ও ফিক্বহ সম্পর্কীয় জ্ঞানের পরিসর বর্ধিত হয়।
ষষ্ঠতঃ ইমাম ইমাম গাজ্জালী, আল-মাওয়ার্দীর মত খলীফার করণীয় কর্তব্যাদির ফিরিস্তি প্রদান করেননি। আর এরূপ কর্তব্য পালনে মুসলিম সমাজের প্রতি খলীফার চুক্তিগত কর্তব্যের কথাও উল্লেখ করেননি। স্পষ্টতঃ ইমাম গাযালী খলীফার পদটিকে মুসলিম সমাজের একমাত্র প্রতীক হিসাবে গণ্য করেন এবং তাঁকে সর্বোচ্চ সম্মানজনক সাংবিধানিক মর্যাদা প্রদান করেন।
সপ্তমতঃ ‘আত-তিবরুল মাসবূক’ বা নছীহাতুল মুলূক (রাজা-বাদশাদের প্রতি উপদেশ) গ্রন্থে ইমাম গাযালী সুলতান-এর উপর প্রাচীন ইরানী শাহদের ও বিগত যুগের খলীফাদের সমস্ত ক্ষমতা ন্যস্ত করেন এবং সুলতানকে উপদেশ দেন যেন তিনি ঐসব পূর্বসূরীদের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে সমাজে কল্যাণকর ন্যায়নিষ্ঠ সুশাসন প্রতিষ্ঠা করেন। এতদসঙ্গে তিনি সামরিক ক্ষমতাধারী, প্রশাসক ও আলেমদেরকে বৈধ খলীফার প্রতি আনুগত্য পোষণ করার ও সৎ উদ্দেশ্য প্রণোদিত হয়ে ইসলামের খাতিরে একযোগে কাজ করার উপদেশ দেন।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় ইমাম মাওয়ার্দীর মত সমসাময়িক খলীফার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করতে তিনি সুলতানকে আত-তিবরুল মসবূকে একটি কথাও বলেননি। অবশ্য কিতাব আল-মুসতাযহিরীতে তিনি খলীফাকে ‘শওকতের’ অধিকারী অর্থাৎ শক্তিধর সুলতানের নিকট এ শর্তে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে উপদেশ দেন যে, এর প্রতিদানে ক্ষমতা গ্রহণকারী সুলতান যেন তাঁর প্রতি আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করেন। কেননা শাসন -প্রশাসনের চূড়ান্ত ক্ষমতা খলীফার হাতে ন্যস্ত, যিনি ‘আহলুল হাল্লে ওয়াল আক্দ’ এর সমর্থন ও আনুগত্যের দাবীদার।
তিনি খলীফাকে ফিক্বহ শাস্ত্র অধ্যয়ন করার উপদেশ দেন। কেননা তিনি শরী‘আত অনুযায়ী জীবন-যাপন করলে ও শরী‘আত অনুসারে শাসনকার্য পরিচালনা করলেই কেবল জনগণের আনুগত্য লাভ করতে পারেন। তিনি পূর্ববর্তী ধর্মীয় শিক্ষক ও ইমামদের প্রদত্ত শাসকদের প্রতি উপদেশাবলীর প্রতি মনোযোগ প্রদান করার জন্যও খলীফাকে উপদেশ দেন। বাস্তবতার উচ্চ স্তরে ইমাম গাযালী সুলতান কর্তৃক খলীফা মনোনয়ন করার সমসাময়িক প্রথার বৈধতা স্বীকার করেন।
‘এহইয়াউ উলূম’-এ তিনি স্পষ্ট করে বলেন, আববাসীয় খলীফাগণ ইমামতের চুক্তি মূলে বৈধ পদাধিকারী এবং এর সমগামী দায়িত্বের বাহক। কিন্তু সরকারের কাজকর্ম সুলতান কর্তৃক পরিচালিত, যিনি খলীফার প্রতি আনুগত্য পোষণ করেন। কেননা সরকার হ’ল ওঁদের হাতে যাঁরা সামরিক শক্তির সমর্থনপুষ্ট এবং খলীফা হ’লেন যিনি ক্ষমতাধরের আনুগত্য লাভ করে থাকেন। যে যাবত খলীফার ক্ষমতা সরকার স্বীকার করে নেয়, সে যাবত সরকার বৈধ। অন্যথায় সরকার যদি গায়ের জোরে প্রতিষ্ঠিত হয়, তা অবৈধ, অরাজকতা সম্পন্ন ও আইন বহির্ভূত। রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও কল্যাণ অবশ্যই সংরক্ষণ করতে হবে। সে কারণ তিনি এমনকি কোন স্বৈরতন্ত্রী সুলতানকেও ক্ষমতাচ্যুত করার প্রতি খলীফা কিংবা জনগণকে উৎসাহ দিতে নারাজ ছিলেন।
বাস্তবে সুলতান হ’ল সার্বিক নিয়ন্ত্রক অর্থাৎ সর্ব বিষয়ে নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার অধিকারী, যিনি খলীফার প্রতি আনুগত্য প্রকাশকারী এবং খলীফার বিশেষ ক্ষমতাবলীর অনুমোদনকারী, যিনি খলীফার নাম খুতবায় ঘোষণা করার ব্যবস্থা করেন ও টাকা-পয়সায় খচিত করেন। তিনি যেসব অঞ্চলের উপর আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হন, তাঁর আদেশ ও বিচার সেসব স্থানে যথার্থই বৈধ। অতএব ইমাম মাওয়ার্দীর যুগে যে ক্ষমতাধারী আমীরকে, আমীরে ইস্তীলা উপাধি দিয়ে বৈধ করা হয়েছিল, ইমাম গাযালীর যুগে তাঁকে সুলতান উপাধি দিয়ে রাষ্ট্রের সর্বেসর্বা বলে স্বীকৃতি দান করা হয়।
উপসংহার : ইমাম ইমাম গাজ্জালী ইসলামী চিন্তা ও আধ্যাত্মিক জ্ঞানের ক্ষেত্রে এক অনন্য পথপ্রদর্শক। তার রচনাগুলো আজও ইসলামের গভীর দিক বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তার শিক্ষা অনুসরণ করলে ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ই উপকৃত হতে পারে।
রেফারেন্স :
১. Al-Ghazali, Abu Hamid. The Revival of the Religious Sciences (Ihya Ulum al-Din), Translated by Fazlur Rahman.
2. Al-Ghazali, Abu Hamid. The Incoherence of the Philosophers (Tahafut al-Falasifah), Translated by Michael Marmura.
3. Frank Griffel, Al-Ghazali’s Philosophical Theology, Oxford University Press.
4. Montgomery Watt, The Faith and Practice of Al-Ghazali, Oneworld Publications.
5. Eric Ormsby, Ghazali: The Revival of Islam, I.B. Tauris.
6. Al-Ghazali, Abu Hamid. Kimya-e-Saadat (The Alchemy of Happiness), Translated by Claud Field.
7. ইমাম গাজ্জালীর রাষ্ট্র দর্শন : ডঃ মুঈনুদ্দীন আহমদ খান
8. ইমাম গাজ্জালী ও তাঁর শিক্ষাদর্শন : মনযূরুল হক

