আমেরিকার ইতিহাসে গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী সময়টি ছিল পুনর্গঠনের। তবে সেই পুনর্গঠনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল সদ্য-মুক্ত হওয়া আফ্রিকান আমেরিকানদের শিক্ষা ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করা। রাষ্ট্রীয় সীমাবদ্ধতার সেই যুগে ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক দানশীলতা কীভাবে একটি জাতির শিক্ষার মেরুদণ্ড তৈরি করেছিল, তার ইতিহাস আজও অনুপ্রেরণা জোগায়।
১৮৬৭ সালে ম্যাসাচুসেটসের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী জর্জ পিবডি আধুনিক শিক্ষামূলক দাতব্য সংস্থার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘পিবডি এডুকেশন ফান্ড’ বিধ্বস্ত দক্ষিণ অঞ্চলের সাধারণ মানুষের জন্য প্রাথমিক শিক্ষার দ্বার উন্মোচন করে। এটি কেবল অর্থ সাহায্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং স্কুল পরিচালনার জন্য কর ব্যবস্থা এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (নরমাল স্কুল) তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
পিবডির এই সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে ১৮৮২ সালে জন এফ. স্ল্যাটার গঠন করেন ‘স্ল্যাটার ফান্ড’। এটিই ছিল আফ্রিকান আমেরিকানদের শিক্ষার জন্য নিবেদিত প্রথম সুনির্দিষ্ট তহবিল। এর হাত ধরেই আফ্রিকান আমেরিকানদের জন্য উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষা ব্যবস্থা বিকশিত হয়। পরবর্তীতে ১৯১৪ সালে এই দুটি ফান্ডের সম্পদ একত্রিত হয়ে আরও শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে শুরু করে।
১৯০৭ সালে আন্না টি. জিমস-এর দেওয়া ১০ লক্ষ ডলারের অনুদান দক্ষিণের গ্রামীণ স্কুলগুলোর চিত্র বদলে দেয়। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘জিমস ফান্ড’ এক অভিনব পদ্ধতি চালু করে, যেখানে ‘জিমস টিচার’ বা বিশেষজ্ঞ শিক্ষকরা বিভিন্ন স্কুলে ঘুরে ঘুরে ব্যবহারিক ও শিল্প শিক্ষা প্রদান করতেন।
এই আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ ছিলেন ভার্জিনিয়া ই. র্যান্ডলফ। তাঁর নিরলস প্রচেষ্টায় ১৯০৮ থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত কয়েক দশক ধরে কৃষ্ণাঙ্গ জনপদগুলোতে শিক্ষার মানোন্নয়ন ঘটে। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ এবং উন্নত নির্দেশনা পদ্ধতি চালুর মাধ্যমে এই কর্মসূচি একটি যুগান্তকারী উদাহরণ সৃষ্টি করে।
শুধুমাত্র পাঠদান নয়, আইনি অধিকার আদায়েও দানশীল সংস্থাগুলোর ভূমিকা ছিল অপরিসীম। সাউদার্ন এডুকেশন ফাউন্ডেশন (SEF) ১৯৫৪ সালের ঐতিহাসিক ‘ব্রাউন বনাম বোর্ড অফ এডুকেশন’ মামলায় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও সমীক্ষা দিয়ে সহায়তা করে, যার ফলে জনশিক্ষায় বর্ণবৈষম্য নিষিদ্ধ হয়। পরবর্তীতে ‘অ্যাডামস বনাম রিচার্ডসন’ মামলার মাধ্যমে উচ্চশিক্ষায় শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গদের আলাদা ব্যবস্থার অবসান ঘটাতেও সংস্থাটি লিগ্যাল ডিফেন্স ফান্ডকে সহায়তা দেয়।
দীর্ঘ সংগ্রামের পরও বৈষম্যের রেশ পুরোপুরি মুছে যায়নি। ১৯৯৮ সালে SEF-এর প্রকাশিত ‘মাইলস টু গো’ নামক প্রতিবেদনে উঠে আসে এক রূঢ় বাস্তবতা। সেখানে দেখা যায়, দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বর্ণবৈষম্য দূর করার চেষ্টা চললেও স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে ভর্তির হার এবং শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে কৃষ্ণাঙ্গরা শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় অনেকটা পিছিয়ে আছে।
বর্তমানে আটলান্টাভিত্তিক পাবলিক চ্যারিটি হিসেবে SEF তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। সংখ্যালঘু শিক্ষকদের সংখ্যা বাড়ানো এবং আফ্রিকান আমেরিকান কলেজগুলোকে শক্তিশালী করা এখন তাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চলা এই দানশীলতার ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠায় কেবল রাষ্ট্রীয় নীতি নয়, বরং সদিচ্ছা ও সামাজিক সংহতিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
(তথ্য সূত্রে Jessie Carney Smith এর একটি শিক্ষা বিষয়ক গবেষণা থেকে)

