Friday, May 8, 2026
35.1 C
Bangladesh

মহাবীর টিপু সুলতানের ইতিহাস (দ্বিতীয় অধ্যায়)

দূরদর্শী টিপু ফ্রান্সের সমরনায়ক ও পরবর্তী সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্টের সহায়তা চাইলেন। নেপোলিয়ন সাহায্যের আশ্বাস দিয়ে চিঠি লিখলেন বটে; কিন্তু সে চিঠি টিপুর আগেই ইংরেজদের হাতে গিয়ে পড়ল। ১৭৯৯ সালের মে মাসের ৪ তারিখ। মারাঠা, ইংরেজ ও নিজামের সমন্বিত তিনবাহিনী জমায়েত হল, টিপুর রাজধানী শ্রীরঙ্গপট্টমের সামনে। ইংরেজ বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন আর্থার ওয়েলেসলি, যিনি পরবর্তীতে ওয়াটার লু’র যুদ্ধে নেপোলিয়নকে হারানোর পর ‘ডিউক অব ওয়েলিংটন ‘ উপাধি লাভ করেন। ৫০ হাজারেরও বেশী শত্রু সৈন্যের বিপরীতে টিপু সুলতানের শিবিরে ছিল সেদিন ৩০ হাজার দেশপ্রেমিক যোদ্ধা। মীর সাদিক ও অন্যান্য বিশ্বাসঘাতকদের সহায়তায় টিপুর দূর্গের ফটক উৎপাটনে বেগ পেতে হয়নি শত্রুপক্ষকে। শত্রুবেষ্টিত টিপুকে পালিয়ে যাবার পরামর্শ দিলেন ফরাসি সেনা উপদেষ্টারা। কিন্তু অকুতোভয় শেরে মহীশূরের মুখ থেকে বেরিয়ে এল, “One day of life as a Tiger is far better than thousand years of living as a Sheep”. ফলে মাতৃভূমি ও আদর্শের জন্য শহীদের মৃত্যুকেই বেছে নিলেন, মহীশূরের বাঘ। মৃত্যুর পর আঘাতে আঘাতে জর্জরিত শরীরেও দেখা গেল—তাঁর মুঠিতে ধরা তরবারি। ঠিক যেন বজ্রের মত পড়তে চাইছিল জালিমদের মাথায়। টিপুর জীবনাবসানে, অপূর্ণ থেকে গেল- জন্মভূমিকে শত্রুমুক্ত করার আজীবনের স্বপ্ন। অপূর্ণ রইল শত্রমুক্ত, অখন্ড সালতানাত প্রতিষ্ঠার বাসনা। সততা, দেশপ্রেম, সাহস আর বীরত্বের বিপরীতে জয় হল শঠতা, নীচতা ও বিশ্বাসঘাতকতার।

টিপুর পরাজয়ের কারণসমূহ: তাঁর পরাজয়ের কারণ হিসেবে প্রথমেই উঠে আসবে, শক্তির তারতম্য। কারন, মহীশূরের একক শক্তিকে লড়তে হয়েছে ইংরেজ, মারাঠা ও হাযদ্রাবাদের সমন্বিত শক্তির বিরুদ্ধে; যেখানে পরাজয়টা প্রায় অনুমিতই ছিল। দ্বিতীয়ত, মীর সাদিক গংদের বিশ্বাসঘাতকতার জন্য সুলতানের উপর আকস্মিকভাবে আক্রমণের সুযোগ পায় ইংরেজরা। তৃতীয়ত, আমরা জানি, সুলতানের সার্বিক শক্তিমত্তাকে ব্রিটিশরা বেশ ভালোভাবেই বিশ্লেষণের সুযোগ পেয়েছিল। সুকৌশলে তারা টিপুর শত্রু মারাঠা ও নিজামের শক্তিকে সমবেত করেছিল নিজেদের পক্ষে। প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের ভূমিকাও এক্ষেত্রে কম নয়। সুলতানকে বাইরের দৃশ্যমান শক্তির পাশাপাশি ঘরের শত্রুদেরও মোকাবেলা করতে হয়েছে বারবার।

চতুর্থত, আমরা বলতে পারি যে, ব্রিটিশরা শিল্প বিপ্লব ও ইউরোপিয় রেঁনেসার সুবাদে, বিশ্বব্যাপি এক অপ্রতিহত শক্তি হিসেবে আবির্ভুত হয়েছিল। সেসময়ের সর্বোচ্চ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ছিল তাদের পাশে। সমরাস্ত্র ও যুদ্ধকৌশলে বৃটিশদের পরাভূত করবার মত শক্তি, সেসময় সমগ্র পৃথিবীতেই আর কারো ছিলনা। উনবিংশ শতাব্দীতে একমাত্র নেপোলিয়ন বোনাপার্ট ছাড়া, তারা আর কারো দ্বারা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়নি। এছাড়া ম্যাকিয়াভেলীর চিন্তায় প্রভাবিত হয়ে, তারা ষড়যন্ত্র ও কূটকৌশল প্রয়োগেও দক্ষ হয়ে উঠে। পঞ্চমত, টিপু যখন একাধিক শত্রুর সাথে লড়েছেন চতুর্দিক থেকে; ইংরেজরা তখন দেশের প্রশাসন ও রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে ধীর-স্থিরভাবে পরিকল্পনা প্রণয়ন করে যুদ্ধে নেমেছ। তাদের জেনারেল ও সৈনিকরা উন্নত অস্ত্র-শস্ত্র ও রসদ পেয়েছে নিরবিচ্ছিন্নভাবে। টিপু সেই তুলনায়, দেশীয় রাজা ও জমিদারদের কাছ থেকে কোনো সহায়তাই পাননি। নিজের উদ্ভাবনী শক্তি ও পুরনো মিত্র ফ্রান্সের সমর সহায়তাই ছিল, তার একমাত্র ইতিবাচক ক্ষেত্র। যেসময় ভারতবর্ষের বৃহত্তর স্বার্থে, সব শত্রতা পরিত্যাগ করে, সবার সম্মিলিত হবার প্রয়োজন ছিল সবচেয়ে বেশী; সেসময় জাতিগত বিভেদ ও ধর্মীয় বিভাজন এমন এক পরিখা খনন করে—যা কেবল ব্রিটিশদের শাসনকেই সুগম করেছে।

টিপু সুলতান ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে, ভারতের মজলুম মানুষের স্বাধীনতা ও সুশাসনের জন্য লড়াই করেছেন আমৃত্যু, এটাই তার সার্থকতা। জীবন দিয়ে হয়তো আযাদীর উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারেননি; কিন্তু ইতিহাসে এমন এক গৌরবোজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন—যা স্বাধীনতাকামী মজলুম মানুষদের প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। আজকের বিশ্ব পরিস্থিতিতে তাই, বিপ্লবী, চিন্তানায়ক, স্বাধীনতাকামী ও আদর্শ প্রতিষ্ঠার যোদ্ধা হিসেবে, তাকে জানার প্রয়োজন অনেক। হিম্মত হারানো পর্যুদস্ত আমাদের সমাজ, তার স্পিরিটে বলীয়ান হবার উপাদান অবশ্যই পাবে।

১৯৯০ সালে ভগওয়ান এস. গিদওয়ানীর উপন্যাস অবলম্বনে তৈরী হয়, ‘দি সোর্ড অব টিপু সুলতান’ নামক ঐতিহাসিক মেগাসিরিয়াল। সঞ্জয় খানের পরিচালনায়, সেই সিরিয়ালটি উপমহাদেশের মানুষকে দিয়েছিল- টিপু সুলতানের জীবন ও ইতিহাসের অনুপম প্রেরণা। অন্যায় ও জুলুমের বিপক্ষে লড়াইয়ে এদের মত মহান যোদ্ধাদের জীবন, আরো বেশী চিত্রিত করা প্রয়োজন। তাদের ঘিরে চিন্তার পুনর্গঠন, আলোচনার বিস্তার, ভিজুয়ালাইজেশন, সাহিত্য ও বিশ্লেষণ তৈরীর কাজ যত বৃদ্ধি পাবে, তার সমানুপাতেই সমাজে শুভ শক্তির সাংস্কৃতিক বিকাশ দ্রুততর হবে। নসীম হিজাজী টিপু সুলতানকে নিয়ে লিখেছেন তাঁর অমর উপন্যাস ‘আওর তলোয়ার টুট গ্যায়ি’। শেষ করব ঐতিহাসিক মহিবুল হাসানের উক্তি দিয়ে, ‘‘Despite the controversies, Tipu Sultan is still viewed as a patriot who played a huge part, along with his father, in delaying the British from taking over the whole of Deccan. He fully understood the threat posed by the British and resisted their advance till his last breath.’’

তথ্যসূত্র:

১) History of Tipu Sultan by Mohibbul Hasan

২) টিপু সুলতানের তরবারি, ভগওয়ান.এস গিদওয়ানি

৩) আওর তলওয়ার টুট গ্যায়ি, নসীম হিজাজী

৪) War, Culture and Society in Early Modern South Asia, 1740–1849, by Kaushik Roy

৫) Confronting Colonialism: Resistance and Modernization Under Haidar Ali & Tipu Sultan by Irfan Habib.

জনপ্রিয়

More like this
Related

শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী (রহঃ) : জীবন ও তৎপরতার সংক্ষিপ্ত রূপ

আরেফিন আল ইমরান সংক্ষিপ্ত আলোচনার মাধ্যমে একজন মহত্তম ব্যক্তিকে তুলে...

বাজার অস্থিরতা: কম্পিউটার এক্সেসরিজের হঠাৎ করে লাগামহীন দাম কেন? কবে ফিরবে স্বাভাবিক দামে ?

দেশের বাজারে কম্পিউটার এক্সেসরিজ বা ইলেকট্রিক পণ্যের বাজার হঠাৎ...

বিশ্বজুড়ে চিনির বিকল্প হিসেবে জনপ্রিয় হচ্ছে,ওষুধি গাছ ‘স্টেভিয়া’

অ্যাস্টার পরিবারের (Asteraceae) ফুলের উদ্ভিদ যা হচ্ছে স্টেভিয়া, (Stevia...