Friday, May 8, 2026
35.1 C
Bangladesh

বুদ্ধদেব বসু : সাহিত্যের এক নিভৃত সেনাপতি

রবীন্দ্র বলয়ের বাইরে সাহিত্য নির্মাণের অন্যতম অগ্রপথিক তিনি। তিরিশের প্রধান কবিদের একজন। কেবল কবি হিসেবেও বাংলা সাহিত্যে তাঁর অবস্থান প্রথম সারিতে। ভাব-ভাষা, সাহিত্যরস, পান্ডিত্য, প্রতিভা ও মেধার সমন্বয়ে শ্রেষ্ঠতম বাঙালিদের একজন। নতুন প্রজন্ম তাঁকে সেভাবে চেনেনা। ফলে মূল্যায়ণের প্রশ্নও সামনে আসেনা। এটা একটা ট্র্যাজেডি। এতো বড় মাপের সাহিত্যিক ও সাহিত্যবোদ্ধা যেকোনো ভাষা ও সংস্কৃতির সম্পদ হিসেবে মূল্যায়িত হবার দাবীদার। বাস্তবে তা ঘটেনি। সাহিত্য নিয়ে যারা গভীরভাবে চিন্তা করেন; কিংবা যারা বাংলা সাহিত্যের পরম্পরা সম্পর্কে সচেতন—কেবল তারাই তাঁকে জানেন। এটাকে ইতিবাচক ও নেতিবাচক: দুইভাবেই দেখার সুযোগ আছে।

শচীন কিংবা ব্রায়ান লারার ব্যাটিং ছিল ক্রিকেটের ধ্রুপদী সৌন্দর্য। তাদের শক্তিমত্তা ও শৈলী এতোই চমকপ্রদ ছিল যে, মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখত দর্শকদের। ইনজামাম, রাহুল দ্রাবিড়, ভিভিএস লক্ষণ কিংবা মোহাম্মাদ ইউসুফরা ঐ দুজনের মত পাদপ্রদীপের আলোয় আসতেননা। তাদের ব্যাটিং ডেপথ ছিল অলস সৌন্দর্যের আকর। যারা গভীরভাবে ক্রিকেটকে দেখেছেন, সেই সৌন্দর্যটা কেবল তাদের চোখেই দৃশ্যমান হয়েছে। সেদিক থেকে আমরা বলতে পারি, বুদ্ধদেব বসু—এবি ডি ভিলিয়ার্স কিংবা বিরাট কোহলি নন। তিনি সহসাই চমক সৃষ্টি করেননা। তাঁকে নিয়ে খুব একটা হইচই হয়না। সাহিত্যের ক্রিজে তিনি একজন নিঃসঙ্গ ‘রাহুল দ্রাবিড়।’

ইমরান খানের বিষয়টা ক্রিকেটে একটা আলাদা অধ্যায়। নিজে তো সেরা অলরাউন্ডার ছিলেনই, সেই সাথে ছিলেন কিংবদন্তী অধিনায়ক। নতুন প্রতিভা চেনা ও তাদের সঠিক উপায়ে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে তাঁর মত লিজেন্ড ক্রিকেট ইতিহাসে বিরল। ওয়াসিম আকরামের মত ‘লেথাল ওয়্যাপনকে’ তিনি ঠিকই চিনেছিলেন। তরুণ ইনজামামকে অনুপ্রাণিত করে যা বানিয়েছিলেন, সেটা ৯২ এর বিশ্বকাপে সবাই দেখেছে। আমাদের মাশরাফির মাঝেও তরুণদের উদ্দীপ্ত করার বিরল যোগ্যতা রয়েছে। সাহিত্যের মঞ্চে বুদ্ধদেব বসুও একজন প্রেরণাদায়ী অধিনায়ক। নতুন কবিদের তিনি পথ দেখিয়েছেন। উৎসাহ দিয়েছেন। লেখা প্রকাশ করেছেন। দিনশেষে নিজে থেকে গেছেন নেপথ্যে। সুধীন্দ্রনাথ, বিষ্ণু দে, সুভাষ, সমর, সুনীল—সবাই তাঁর কাছ থেকে রসদ পেয়েছেন। আর জীবনানন্দকে আপামর পাঠকের সামনে আনার জন্য তাঁর যে আন্তরিক প্রচেষ্টা—সেটা অবশ্যই বাংলা সাহিত্যের অভিনব অধ্যায়।

রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের পর সামগ্রিকতার বিচারে বুদ্ধদেবই বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে বড় প্রতিভা। কবিতা, উপন্যাস, ছোট গল্প, নাটক, সাহিত্য সমালোচনা প্রভৃতি মিলিয়ে তাঁর রচনাবলী অত্যন্ত সমৃদ্ধ। তাঁর ভাষাগত শক্তিমত্তা বিস্ময়কর পর্যায়ের ! তাঁর কবিতার সামগ্রিক সৌন্দর্য হৃদয়কে আলোড়িত করে দারুণভাবে। তাঁর গদ্য বা উপন্যাস—সেসবও যেন এক-একটি কবিতা। কবিতাই ঠিকরে পড়ছে সব কিছু থেকে। এমনকি সাহিত্য সমালোচনার ক্ষেত্রেও তাঁর শব্দচয়ন ও প্রকাশভঙ্গী অনেকটাই কবিতার মত। হয়তো এজন্যই নিজেকে কেবল ‘কবি’ হিসেবেই ভাবতেন ও পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন।

সাহিত্য সংগঠক হিসেবে বুদ্ধদেব বসু কতোটা উঁচু পর্যায়ের ছিলেন—তা এতো স্বল্প পরিসরে পর্যালোচনা করা সম্ভব নয়। তিনি নিজেই কেবল বড় প্রতিভা ছিলেননা; সেই সাথে নতুন প্রতিভা বিকাশের জন্যও সংগ্রাম করতেন। সেটা আন্তরিকতা এবং সততার সাথেই করতেন। এরকম ঔদার্য ও মননশীলতা আজকের বাংলা সাহিত্যে একেবারেই বিরল। এক ‘কবিতা’ পত্রিকা দিয়েই যা করেছেন, তা ইতিহাস হয়ে আছে।

তাঁর রচিত ‘বন্দীর বন্দনা’ বাংলা কবিতার ইতিহাসে সেরা দশ কবিতার একটি। তাঁর ‘তিথিডোর’ উপন্যাস—ভাষাগত শক্তি, গল্পের বুনন, চরিত্র চিত্রায়ণ এবং কাব্যিক বর্ণনার জন্য এক অনন্য সৃষ্টি কর্ম। যেদিন ফুটল কমল, নির্জন স্বাক্ষর কিংবা মৌলিনাথ কোনোটাই উপেক্ষা করার মত রচনা নয়। কবিতা দিয়ে তিনি জন্ম দিলেন ‘কঙ্কাবতী’ নামক চরিত্র। কঙ্কা কখনই জীবনানন্দের ‘বনলতা সেন’ হয়ে উঠতে পারেনি। এমনকি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় রচিত ‘নীরা’ চরিত্রটির মতও জনপ্রিয়তা পায়নি। কঙ্কাবতী আন্ডাররেটেড; তবে তা সত্ত্বেও—কবিতার এক চিরায়ত চরিত্র। নির্জনতায় পুড়ে, নিঃসঙ্গতায় খাক হয়ে; ক্রমাগত কবি হয়ে ওঠার যে সাধনা—‘কঙ্কাবতী’ তার বিশ্বস্ত চিত্রায়ণ। আর সাহিত্য সমালোচনায় আবু সয়ীদ আইয়ুব যদি একজন পথিকৃৎ হন; তবে বুদ্ধদেব বসুও একজন অনন্য কর্ণধার।

তারপরও তিনি সেইভাবে পরিচিত ও আলোচিত নন। এর কারণগুলো দীর্ঘ পর্যালোচনার দাবী রাখে। আমার মনে হয়, এর পেছনে দায়ী তাঁর নিজস্ব চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য। সর্বদা নিভৃত ও নির্জন থাকার প্রবণতাই হয়তো তাঁকে ব্যাকফুটে ঠেলে দিয়েছে। তিনি নজরুলের মত উদ্দীপ্ত ও শক্তিশালী অ্যাপিয়ারেন্স শো করতেননা। আবার যেকোনো সভায় রবীন্দ্রনাথের মত সবটুকু আলো নিজের করে নেবেন; এমনও ছিলেননা। এমন নেপথ্যে থাকার ইচ্ছে—তাঁকে সত্যিকার অর্থেই নেপথ্যে রেখেছে। আরেকটা বড় কারণ, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ক্রমবিকাশ। পরবর্তীতে সাহিত্য যেভাবে বাণিজ্যিক ও অসাধু প্রবণতায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে; তিরিশ-চল্লিশ বা পঞ্চাশের দশকে সম্ভবত তেমনটা ছিলনা। মনে হয় যেন, অসৎ সাহিত্যিক ও খ্যাতিলোভীদের লঘুত্বের ভিড়ে প্রকৃত নেতা স্তিমিত হয়েছেন। আসলে সেটা সর্বার্থে সত্য নয়। মূল কথা হল—প্রকৃত সাহিত্যিক ও চিন্তাশীল পাঠকসমাজে বুদ্ধদেব বসু আজো সক্রিয় আলোতে বিরাজমান। তাঁর পরিসর ছোট হয়ে এসেছে; তবে তা বিলুপ্ত হয়নি। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তিনি অবশ্যই একজন কিংবদন্তী চরিত্র। আমাদের সাহিত্যের ক্রমবিকাশ ও উন্নয়নের ধারায় তাঁকে অগ্রাহ্য করা অসম্ভব। এই প্রজন্ম অস্থির চিত্ত ও ভাষাগত দুর্বলতার জন্য হয়তো তাঁর রচনাবলীর প্রকৃত স্বাদ নিতে পারবেনা। কিন্তু যারা প্রকৃত অর্থেই সাহিত্যপ্রেমী, তাদের কাছে ‘বুদ্ধদেব বসু’—লিজেন্ড বলেই বিবেচিত হবেন।

সঙ্গীত প্রতিভা না থাকাটা—বুদ্ধদেব বসুর একটা বড় দুর্বলতা (এটা একান্তই আমার অভিমত)। অতুলপ্রসাদ, দ্বিজেন্দ্রলাল, বা রজনীকান্তরা কেউই তাঁর সমান প্রতিভাবান ছিলেননা। অথচ সঙ্গীত প্রতিভা থাকায় তারা যেভাবে কালোত্তীর্ণ হয়েছেন; সেটা বুদ্ধদেব বসুর ক্ষেত্রে ঘটেনি। মিউজিক এক্ষেত্রে ডিসাইসিভ রোল প্লে করেছে। সঙ্গীতের অনন্য প্রতিভাবলে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল ইসলাম সবসময়ই প্রাসঙ্গিক থেকেছেন এবং থাকবেন। কারণ, সাহিত্যের অপরাপর শাখাগুলো যতোটা শক্তিশালী; সঙ্গীত কালের পরিক্রমায় তাদের হারিয়ে দিতে সক্ষম।

জনপ্রিয়

More like this
Related

শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী (রহঃ) : জীবন ও তৎপরতার সংক্ষিপ্ত রূপ

আরেফিন আল ইমরান সংক্ষিপ্ত আলোচনার মাধ্যমে একজন মহত্তম ব্যক্তিকে তুলে...

বাজার অস্থিরতা: কম্পিউটার এক্সেসরিজের হঠাৎ করে লাগামহীন দাম কেন? কবে ফিরবে স্বাভাবিক দামে ?

দেশের বাজারে কম্পিউটার এক্সেসরিজ বা ইলেকট্রিক পণ্যের বাজার হঠাৎ...

বিশ্বজুড়ে চিনির বিকল্প হিসেবে জনপ্রিয় হচ্ছে,ওষুধি গাছ ‘স্টেভিয়া’

অ্যাস্টার পরিবারের (Asteraceae) ফুলের উদ্ভিদ যা হচ্ছে স্টেভিয়া, (Stevia...