বিশেষ প্রতিনিধি: আমরা প্রতিদিন কী খাচ্ছি, খাবারটা কতটা সুষম বা তাতে কত ক্যালরি আছে—তা নিয়ে আমাদের ভাবনার শেষ নেই। কিন্তু ঠিক ‘কাদের সাথে’ বসে খাচ্ছি, এই ছোট্ট অভ্যাসটি যে আমাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের গতিপথ বদলে দিতে পারে, তা হয়তো অনেকেরই অজানা। চিকিৎসা বিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞানের সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, খাবারের থালায় কী আছে তার চেয়েও অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে টেবিলের অপর পাশে কে বসে আছেন।

সমাজবিজ্ঞান ও বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘কমেনসালিটি’ (Commensality) বা যৌথ আহার। প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা এই সাধারণ অভ্যাসটিই নাকি আধুনিক যুগের বহু জটিল মানসিক ও শারীরিক ব্যাধির প্রাকৃতিক ওষুধ। গবেষকরা নিশ্চিত করেছেন, নিয়মিত প্রিয়জনদের সঙ্গে বসে খেলে ডিমেনশিয়া (স্মৃতিভ্রংশ) ও বিষণ্নতার (ডিপ্রেশন) ঝুঁকি বিস্ময়করভাবে কমে যায়, কমে মানসিক চাপ, এমনকি বৃদ্ধি পায় মানুষের গড় আয়ুও।চীনের ঝেজিয়াং প্রোভিন্সিয়াল সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের একটি গবেষণায় প্রায় দশ হাজার প্রবীণ নারীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। গবেষণায় দেখা যায়, একজন মানুষ দৈনিক কতজনের সাথে বসে খাচ্ছেন, তার ওপর তাঁর বিষণ্নতায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সরাসরি নির্ভর করে। এমনকি ব্যক্তি একাকী থাকেন কি না, কিংবা তাঁর আর্থসামাজিক অবস্থা কেমন—সেসব বিষয় হিসাব থেকে বাদ দিলেও যৌথ আহারের ইতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট থেকেই যায়।
একই চিত্র ফুটে উঠেছে টোকিওর এক গবেষণায়। সেখানে দেখা গেছে, পরিবারের সাথে থেকেও যারা আলাদা বা একা একা খাবার খান, তাঁদের মধ্যে বিষণ্নতার লক্ষণ দেখা দেওয়ার আশঙ্কা যৌথভাবে খাওয়া মানুষের চেয়ে প্রায় পাঁচ গুণ বেশি।
অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির আচরণগত বিজ্ঞানের অধ্যাপক জ্যান-ইমানুয়েল দে নেভ ‘ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট’-এর তথ্যের ভিত্তিতে জানান, বিশ্বজুড়ে প্রায় দেড় লাখ মানুষের ওপর সমীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে, সপ্তাহে যারা যত বেশি বেলা অন্যদের সাথে আহার শেয়ার করেন, তাঁদের জীবনযাত্রার সন্তুষ্টির মাত্রা ততটাই উঁচুতে থাকে। একজন মানুষের মানসিক তৃপ্তির ক্ষেত্রে তাঁর কর্মসংস্থান বা আয়ের মাত্রা যতটা প্রভাব ফেলে, একসঙ্গে খাওয়ার প্রভাব তার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।
কিন্তু যৌথ আহার কেন এতটা প্রভাবশালী? নৃবিজ্ঞানীদের মতে, যখন মানুষ একে অপরের সাথে খাদ্য ভাগ করে নেয়, তখন মস্তিষ্কে ‘এন্ডোরফিন’ নামের ফিল-গুড হরমোনের ক্ষরণ বাড়ে। এই রাসায়নিক উপাদানটি মানুষের মনকে ভেতর থেকে উৎফুল্ল করে তোলে এবং পারস্পরিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করে। আমেরিকার পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, একা একটি চকোলেট খাওয়ার চেয়ে অন্য একজনের উপস্থিতিতে সেটি খেলে তা তুলনামূলক অনেক বেশি সুস্বাদু মনে হয়। অর্থাৎ, মানুষের উপস্থিতি খাবারের আস্বাদন ও আনন্দকেও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
যৌথ আহার কেবল মন ভালো রাখে না, এটি বার্ধক্যে মস্তিষ্কের অবক্ষয় ঠেকায়। জাপানি গবেষকদের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে যারা একাকী খাবার খান, বয়স বাড়ার সাথে সাথে তাঁদের মস্তিষ্কের মেডিয়াল টেম্পোরাল লোব এবং হিপোক্যাম্পাস অঞ্চলের আয়তন সংকুচিত হতে থাকে—যে অঞ্চলগুলো স্মৃতিশক্তি ও বুদ্ধিমত্তা নিয়ন্ত্রণের জন্য সরাসরি দায়ী।
খাবারের টেবিলে আড্ডা, হাসাহাসি ও কথোপকথন মানসিক চাপ (স্ট্রেস) কমাতে সাহায্য করে। একই সাথে এই সামাজিক মিথস্ক্রিয়া মস্তিষ্ককে সক্রিয় ও উদ্দীপিত রাখে, যা পরবর্তী জীবনে ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রংশের ঝুঁকি তৈরি হতে বাধা দেয়।আধুনিক যান্ত্রিক জীবন ও ডিজিটাল প্রযুক্তির বহুল ব্যবহারে মানুষ আজ দিন দিন একাকী হয়ে পড়ছে। যুক্তরাজ্য বা যুক্তরাষ্ট্রে মানুষ সপ্তাহে গড়ে ৭ থেকে ৮ বার অন্যদের সাথে খায়, যেখানে ইতালিতে এই সংখ্যা ৯ বা তারও বেশি। ইতালির ঐতিহ্যবাহী ‘স্লো ফুড মুভমেন্ট’ বা ইউনেস্কোর হেরিটেজ স্বীকৃতি—সবকিছুতেই তাদের খাবারের টেবিল কেন্দ্রিক পারিবারিক বন্ধনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।মনোবিজ্ঞানীদের মতে, একাকীত্ব কাটাতে বিশাল আয়োজনের প্রয়োজন নেই। সহকর্মী, পুরনো বন্ধু বা প্রতিবেশীকে বাসায় একবেলা খাওয়ার আমন্ত্রণ জানানো কিংবা পরিবারের সবাইকে নিয়ে দিনে অন্তত একবার একসঙ্গে খেতে বসাই হতে পারে এই শারীরিক ও মানসিক সুস্বাস্থ্যের সহজ চাবিকাঠি।

